তথ্য প্রযুক্তি ডেস্ক:
একটি পুরোনো অ্যালবাম খুললে যেমন চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফিকে হয়ে যাওয়া কোনো বিকেলের স্মৃতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন তেমনই দেখা যাচ্ছে আশির দশকের নানা দৃশ্য। ছবিতে রঙিন শার্ট, সে সময়ের চুলের স্টাইল, পুরোনো রাস্তা, দোকান কিংবা সিনেমার পোস্টার সবকিছুই যেন কয়েক দশক আগের কোনো মুহূর্তের দৃশ্য। কিন্তু বাস্তবে এসব ছবির অনেকগুলোর অস্তিত্ব কখনোই ছিল না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি হচ্ছে এসব ‘পুরোনো’ ছবি।
ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের ছবি ব্যবহার করে আশির দশকের আবহ তৈরি করে ছবি প্রকাশের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। কেউ নিজেকে দেখছেন কয়েক দশক আগের পোশাকে, কেউ ফিরে যাচ্ছেন পুরোনো দিনের রাস্তায়। আবার কেউ বন্ধু, ভাই-বোন কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এমন দৃশ্য তৈরি করছেন, যার কোনো বাস্তব স্মৃতি বা ঘটনার অস্তিত্ব নেই।
প্রযুক্তির ভাষায় এগুলো এআই-জেনারেটেড ইমেজ। তবে ব্যবহারকারীদের কাছে এগুলো অনেকটা হারিয়ে যাওয়া সময়কে কল্পনার মাধ্যমে ফিরে পাওয়ার মতো।
কেন আশির দশক?
এআইয়ের তৈরি রেট্রো ছবিতে আশির দশকের উপস্থিতির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে নস্টালজিয়া। বিশেষ করে ওই সময়ে বেড়ে ওঠা মানুষের কাছে আশির দশক মানেই ক্যাসেট, ভিসিআর, ফিল্ম ক্যামেরা, রঙিন পোশাক, বড় চুল, পুরোনো সিনেমার পোস্টার, পাড়ার দোকান ও দীর্ঘ আড্ডার স্মৃতি।
সে সময়ের প্রযুক্তি ছিল তুলনামূলক সীমিত। ফলে ছবির মানেও ছিল আজকের মতো নিখুঁত নয়। ছবিতে থাকত গ্রেইন, আলো-ছায়ার ভিন্নতা, কিছুটা বিবর্ণ রং কিংবা ক্যামেরার সীমাবদ্ধতার ছাপ। বর্তমানের অতিরিক্ত পরিষ্কার ও নিখুঁত ডিজিটাল ছবির বিপরীতে সেই ‘অসম্পূর্ণতাই’ এখন নতুন করে আকর্ষণ তৈরি করছে।
এআই প্রযুক্তি পুরোনো ফিল্ম ক্যামেরার লুক, বিবর্ণ রং, আলো-ছায়া, পোশাক ও পরিবেশের বৈশিষ্ট্য অনুকরণ করতে পারছে। ফলে তৈরি হচ্ছে এমন ছবি, যা দেখতে পুরোনো দিনের আসল আলোকচিত্রের মতো মনে হয়।
স্মৃতির পাশাপাশি কল্পনাও
এই প্রবণতা শুধু আশির দশকে বেড়ে ওঠা মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমান প্রজন্মের অনেক তরুণ-তরুণীও রেট্রো সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী। তাদের অনেকেরই আশির দশকের সরাসরি কোনো অভিজ্ঞতা নেই। ফলে এ ক্ষেত্রে বাস্তব স্মৃতির পাশাপাশি কাজ করছে কল্পিত স্মৃতি।
অর্থাৎ এআইয়ের মাধ্যমে মানুষ এমন একটি অতীত নির্মাণ করছেন, যেখানে তিনি বাস্তবে কখনো ছিলেন না। নিজের বর্তমান ছবিকে অতীতের পোশাক, পরিবেশ ও সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করছেন একটি ‘যদি এমন হতো’ ধরনের দৃশ্য।
কীভাবে তৈরি হচ্ছে এআইয়ের ‘পুরোনো’ ছবি?
এ ধরনের ছবি তৈরিতে সাধারণত একটি ব্যক্তিগত ছবি ও নির্দিষ্ট নির্দেশনা ব্যবহার করা হয়। নির্দেশনায় বলা হতে পারে ছবিটি যেন আশির দশকের ফিল্ম ক্যামেরায় তোলা মনে হয়, পোশাক ও চুলের ধরন যেন ওই সময়ের হয়, পেছনে থাকে পুরোনো দিনের রাস্তা, দোকান বা বাড়ির পরিবেশ এবং ছবির রং যেন কিছুটা বিবর্ণ হয়।
এরপর এআই মানুষের মুখের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ধরে রেখে পোশাক, পটভূমি, আলো ও পরিবেশকে নতুনভাবে তৈরি করে। ফলে এমন একটি দৃশ্য তৈরি করা সম্ভব হয়, যেখানে একজন মানুষকে এমন একটি সময় ও স্থানে দেখানো যায়, যেখানে তিনি বাস্তবে কখনো ছিলেন না।
এক অর্থে এটি ডিজিটাল সময়ভ্রমণের মতো বাস্তবে অতীতে যাওয়া সম্ভব না হলেও প্রযুক্তির সাহায্যে অতীতের একটি কল্পিত দৃশ্য তৈরি করা যাচ্ছে।
ছবির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
একসময় ছবি ছিল কোনো ঘটনা বা সময়ের দৃশ্যমান প্রমাণগুলোর অন্যতম। কোনো ব্যক্তি কোনো জায়গায় ছিলেন কি না, কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না তা বোঝাতে ছবির গুরুত্ব ছিল অনেক।
কিন্তু জেনারেটিভ এআই সেই ধারণার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এখন এমন ছবি তৈরি করা সম্ভব, যেখানে কোনো ব্যক্তি বাস্তবে কখনো উপস্থিত ছিলেন না, কোনো ঘটনাও ঘটেনি; অথচ ছবিটি দেখতে এতটাই বাস্তব হতে পারে যে সাধারণ চোখে সেটিকে আসল ছবি বলে মনে হতে পারে।
ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেখার ক্ষেত্রে শুধু ছবির সৌন্দর্য বা আকর্ষণ নয়, এর সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
এআই ছবিতে লেবেল
এআই-তৈরি কনটেন্টের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিচয় স্পষ্ট করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি বা সম্পাদিত কনটেন্ট শনাক্ত করে ব্যবহারকারীদের জানানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।
মেটা তাদের ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও থ্রেডসে এআই-তৈরি ছবি শনাক্ত হলে ‘AI Info’ লেবেল প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো ব্যবহারকারীকে জানানো যে সংশ্লিষ্ট কনটেন্টটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি বা সম্পাদিত হতে পারে।
এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি নিয়ে একটি নতুন বাস্তবতা সামনে এসেছে। ছবি এখন শুধু স্মৃতি বা ঘটনার দৃশ্যমান দলিল নয়; এটি হতে পারে কল্পনা, বিনোদন কিংবা প্রযুক্তির তৈরি একটি বাস্তবসম্মত দৃশ্যও।
আশির দশকের এআই ছবি তাই শুধু একটি নতুন ট্রেন্ড নয়। এর মধ্য দিয়ে প্রযুক্তি যেমন মানুষের পুরোনো দিনের প্রতি আকর্ষণকে নতুনভাবে প্রকাশের সুযোগ করে দিচ্ছে, তেমনি ছবি কতটা সত্য সেই প্রশ্নটিকেও আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।

