বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ যোগাযোগ আমাদের পরিচয়
English
সর্বশেষ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এমপি হেলাল দিঘলিয়ার সারোয়ার খান কলেজ সরকারিকরণের উদ্যোগ ● বৃষ্টির শঙ্কায় বাংলাদেশ-চীন ম্যাচ, পরিত্যক্ত হলে সেমিফাইনালে বাংলাদেশ ● নতুন কুঁড়ির ৩০৬ প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদকে বিকেএসপিতে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ সরকারের ● ভূমি অফিসে হাজিরা নিশ্চিত করতে চালু হচ্ছে ‘ভূমিদৃষ্টি’ অ্যাপ ● ভারতীয় ইলিশকে দেশীয় বলে বিক্রি, যশোরে আড়তদারকে জরিমানা
মুক্ত জানালা

পিংক বাস নয়, খুলনার জন্য কয়েকটা সাদা কালো রং এর গণপরিবহন বাস ই যথেষ্ট

এম সাইফুল ইসলাম

একটি শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থা কেবল কিছু বাসের চলাচলের নাম নয়; এটি সেই শহরের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং নাগরিক জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি মৌলিক অবকাঠামো।
একটি নির্ভরযোগ্য বাস যখন একজন শিক্ষার্থীকে সময়মতো শ্রেণিকক্ষে পৌঁছে দেয়, একজন শ্রমজীবী মানুষকে স্বল্প খরচে কর্মস্থলে নিয়ে যায় কিংবা একজন কর্মজীবী নারীকে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে সাহায্য করে তখন সেটি নিছক পরিবহন থাকে না; হয়ে ওঠে নাগরিক জীবনের অন্যতম চালিকাশক্তি।

এই বাস্তবতায় রাজধানী ঢাকার পর দেশের আরও দুটি শহরে নারীদের জন্য ‘পিংক বাস’ চালুর উদ্যোগ আলোচনায় এসেছে। কর্মজীবী নারী, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যটি গুরুত্বপূর্ণ। নারীর চলাচলের স্বাধীনতা, কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ এবং নগরজীবনে সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে নিরাপদ গণপরিবহনের বিকল্প নেই।
কিন্তু এই আলোচনার মধ্যেই খুলনার একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে খুলনার জন্য আমাদের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?
আমার কাছে উত্তরটি খুব জটিল নয়।

পিংক বাস না হলেও চলবে। খুলনার আগে দরকার কয়েকটি সাধারণ বাস যেগুলো নিয়মিত চলবে, নির্ধারিত ভাড়ায় চলবে, নির্দিষ্ট স্টপেজে থামবে এবং কোনো অদৃশ্য পরিবহন নিয়ন্ত্রণের কাছে যাত্রীকে জিম্মি করবে না।
বাসের রং নয়, চলাচলই গুরুত্বপূর্ণ
নারীদের জন্য আলাদা বাসের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কোথাও এটি কার্যকর উদ্যোগও হতে পারে। কিন্তু কোনো শহরের গণপরিবহন নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত শহরের মানুষের জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন আছে কি না।
যদি একটি শহরের সাধারণ মানুষই প্রতিদিন বাসের সংকটে পড়েন, যদি নির্দিষ্ট রুটে পর্যাপ্ত বাস না থাকে, যদি ভাড়া নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে এবং যদি সময়সূচি কার্যত অনুপস্থিত থাকে তাহলে শুধু বিশেষ শ্রেণির জন্য নতুন পরিবহন চালু করলেই সামগ্রিক সংকটের সমাধান হবে না।

খুলনার বাস্তবতাও অনেকটা এমন। রূপসা থেকে ফুলতলা পর্যন্ত ‘নগর পরিবহন’ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে কার্যকরভাবে চালু নেই এ অভিযোগ ও ভোগান্তির কথা নগরবাসীর মুখে মুখে। অথচ রূপসা-ফুলতলা রুট খুলনা নগর ও আশপাশের মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
একটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে গণপরিবহন দুর্বল হয়ে পড়লে তার প্রভাব কেবল বাসস্ট্যান্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে, চাকরিজীবীর কর্মঘণ্টায়, ব্যবসায়ীর কাজে, রোগীর হাসপাতালে পৌঁছানোর সময়ে এবং একটি পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর।
গণপরিবহনের সংকট আসলে অর্থনৈতিক সংকটও
পরিবহন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই ‘যাতায়াতের সমস্যা’ কথাটিকে খুব ছোট করে দেখি। অথচ একটি শহরের পরিবহন সংকট সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
যখন সাশ্রয়ী বাস কমে যায়, তখন মানুষ বাধ্য হয়ে তুলনামূলক ব্যয়বহুল যানবাহনের ওপর নির্ভর করেন। প্রতিদিন কয়েকবার অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হলে মাস শেষে সেটি একটি পরিবারের বাজেটে বড় চাপ তৈরি করে।
নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য এই চাপ আরও বেশি।
একজন শিক্ষার্থী প্রতিদিন বাড়তি ভাড়া দিলে তার শিক্ষা ব্যয় বাড়ে। একজন শ্রমিকের যাতায়াত ব্যয় বাড়লে তার প্রকৃত আয় কমে যায়। একজন চাকরিজীবী নারী যদি নিরাপত্তার কারণে তুলনামূলক ব্যয়বহুল পরিবহন বেছে নিতে বাধ্য হন, তাহলে কর্মজীবনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তটিও প্রভাবিত হতে পারে।
অর্থাৎ গণপরিবহন সস্তা ও নির্ভরযোগ্য হওয়া শুধু পরিবহন নীতি নয়; এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায্যতারও প্রশ্ন।
খুলনার দরকার ‘বাস-ভিত্তিক’ বাস্তব সমাধান
খুলনা ঢাকার মতো মেগাসিটি নয়। তাই নগর পরিবহন পরিকল্পনাও খুলনার আকার, জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও যাতায়াতের ধরন বিবেচনায় তৈরি হওয়া প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে বড় কোনো ব্যয়বহুল প্রকল্পের আগে কয়েকটি বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
রূপসা-ফুলতলা রুটসহ গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোতে পর্যাপ্ত বাস চালু করা, নির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ ও অনুসরণ করা, নির্ধারিত স্টপেজ নিশ্চিত করা, ভাড়া কাঠামো স্বচ্ছ রাখা, যাত্রীদের অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা করা এবং বাসের ফিটনেস ও চালকদের দক্ষতা নিয়মিত যাচাই করা এসব পদক্ষেপ তুলনামূলকভাবে সরাসরি বাস্তবায়নযোগ্য।
বাস কোথা থেকে কোথায় যাবে, কত ভাড়া নেবে, কোথায় থামবে, কখন চলবে এসব বিষয়ে যাত্রীর জানার অধিকার রয়েছে। পরিবহন ব্যবস্থায় অনিয়ম, অতিরিক্ত ভাড়া কিংবা যাত্রী হয়রানির অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত ও প্রতিকারের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
একটি আধুনিক নগর পরিবহন ব্যবস্থা মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে নির্ভরযোগ্যতা, নিরাপত্তা ও সামর্থ্য।
যাত্রী জানবেন কখন বাস পাবেন। জানবেন কত ভাড়া দিতে হবে। জানবেন কোথায় বাস থামবে। এবং জানবেন কোনো সমস্যায় কোথায় অভিযোগ করবেন।
এই সাধারণ নিশ্চয়তাগুলোই একজন নাগরিকের কাছে গণপরিবহনকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
উন্নয়নের মাপকাঠি বদলাতে হবে
একটি শহরের উন্নয়নকে শুধু নতুন সড়ক, সড়কবাতি, স্থাপনা কিংবা বড় প্রকল্প দিয়ে বিচার করলে নাগরিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশটি অদৃশ্য থেকে যায়।
উন্নয়নের আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো একজন সাধারণ মানুষ তার বাড়ি থেকে কর্মস্থলে কত সময়ে পৌঁছান? একজন শিক্ষার্থী কতটা নিরাপদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারেন? একজন রোগী কত সহজে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন? একজন নারী সন্ধ্যার পরও কি নিরাপদে গণপরিবহন ব্যবহার করতে পারেন? আর একজন নিম্ন আয়ের মানুষ তার আয়ের কতটা অংশ প্রতিদিন যাতায়াতে ব্যয় করছেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই একটি শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায়।
খুলনার নাগরিকদের চাওয়াও তাই খুব বড় কিছু নয়।
তারা হয়তো এখনই কোনো বিলাসবহুল পরিবহন ব্যবস্থা দাবি করছেন না। তারা চাইছেন—বাস থাকুক, নিয়মিত চলুক, ভাড়া নাগালের মধ্যে থাকুক এবং যাত্রাপথ নিরাপদ হোক।

খুলনার মানুষ বিশেষ কোনো সুবিধা দাবি করছে না। তারা চাইছে তাদের ন্যায্য নাগরিক অধিকার।
পিংক বাস না হোক—বাস তো হোক।
রং না হোক—চলাচলটা স্বাভাবিক হোক।
নতুন প্রতিশ্রুতি না হোক—বিদ্যমান পরিবহন ব্যবস্থা সচল হোক।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

একটি মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Notice: ob_end_flush(): Failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/modhumot/public_html/wp-includes/functions.php on line 5493