মধুমতি ডেস্ক:
দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পূর্ণ করছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসার পর প্রথম ১৮০ দিনে রাষ্ট্র পরিচালনায় একদিকে বেশ কিছু দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে অর্থনীতি, জ্বালানি, আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্নও।
সরকারের নিজস্ব মূল্যায়নে প্রথম ছয় মাসকে মূলত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, অর্থনীতি স্থিতিশীল করা, জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সময় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। শিগগিরই এই মূল্যায়ন একটি বুকলেট আকারে প্রকাশের কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, এ উপলক্ষে ১৭ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনও হতে পারে।
তবে ছয় মাসের মূল্যায়ন কেবল সরকারের অর্জনের তালিকা দিয়ে শেষ করার সুযোগ নেই। কারণ অনেক কর্মসূচি এখনো বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে। ফলে সরকারের জন্য আসল পরীক্ষা হবে ঘোষণা কতটা কার্যকর সেবায় রূপ নেয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তার প্রভাব কতটা পড়ে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন বার্তার চেষ্টা
সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন বদলের বার্তা। সরকারি অফিস, আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নেতাদের ছবি টানানোর প্রচলন বন্ধ, সরকারি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহারে সংযম এবং ভিআইপি সংস্কৃতি কমানোর উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক প্রশাসনের ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে।
সরকারি ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রেও কয়েকটি সিদ্ধান্ত সামনে আনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি গাড়ির পরিবর্তে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার, কনভয়ের আকার ছোট করা এবং বিদেশ সফর ও সরকারি আপ্যায়নে ব্যয় কমানোর কথা বলা হয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর মাসিক মূল বেতনের ১০ শতাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার তথ্যও মূল্যায়নে রাখা হয়েছে।
তবে এই বার্তার দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এর কতটা স্থায়ী প্রভাব পড়ে তার ওপর।
সংসদে আইন প্রণয়নে গতি
বর্তমান সংসদের ৫২টি কার্যদিবসে ১০৫টি বিল পাসের বিষয়টিকে সরকারের আইন প্রণয়নের সক্ষমতার একটি সূচক হিসেবে দেখানো হয়েছে।
তবে শুধু কতটি আইন পাস হয়েছে—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এসব আইনের বাস্তব প্রয়োগ, সংসদীয় বিতর্কের মান এবং আইনগুলো জনগণের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করছে।
অর্থনীতি: স্থিতিশীলতার চেষ্টা, সামনে কঠিন পরীক্ষা
সরকারের ছয় মাসের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকারগুলোর একটি ছিল অর্থনীতি পুনরুদ্ধার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেওয়া হয়েছে। প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার তিন ধাপের ‘থ্রি-আর’ কৌশল সামনে এনেছে রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন, রেস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসেলারেশন।
ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করতে সময় প্রায় এক বছর থেকে কমিয়ে ১৪ দিনে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকদের অর্থায়ন এবং সবুজ বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের চারটি পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিতে ১৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও মূল্যায়নে এসেছে।
২০২৫ সালে নিট প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ ৪৪ শতাংশ বেড়ে ১৭৮ কোটি ডলারে পৌঁছানোর তথ্যও সরকারের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সূচক বাজারে মানুষের স্বস্তি—সেটিই হবে সরকারের জন্য কঠিন মাপকাঠি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম বড় অংশ ছিল কর্মসংস্থান। ২০২৬-৩১ মেয়াদে প্রায় এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের জিইডির প্রস্তাব অনুযায়ী দেশে ও বিদেশে মিলিয়ে ৯৩ লাখ ২৭ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
শিল্পায়ন, উদ্যোক্তা তৈরি, স্টার্টআপ, অনানুষ্ঠানিক খাত ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু সরকারি প্রকল্প যথেষ্ট নয়। বেসরকারি বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তি, শিল্পায়নের গতি এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন সবকিছু একসঙ্গে এগোতে হবে।
খাদ্য মজুতে স্বস্তির চিত্র
খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সরকার তুলনামূলকভাবে পরিমাপযোগ্য অগ্রগতির দাবি করেছে।
২৮ জুন পর্যন্ত সরকারি গুদামে ২২ লাখ ১০ হাজার ৯৪৫ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য মজুত ছিল বলে জানানো হয়েছে। এটি নির্ধারিত নিরাপদ মজুতের চেয়ে প্রায় ৮ লাখ ৬০ হাজার ৯৪৫ টন বেশি।
বোরো সংগ্রহ অভিযানে ২ লাখ ৭১ হাজার ৩১২ টন ধান এবং ৭ লাখ ৯৮ হাজার ৯১২ টন চাল সংগ্রহের তথ্যও দেওয়া হয়েছে।
সরকারের দাবি, এই মজুত বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং জরুরি সময়ে খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরাসরি সহায়তা
জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে সরাসরি সুবিধাভোগীর কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার নীতি সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও স্বাস্থ্য কার্ড।
ক্ষুদ্র কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের উদ্যোগে প্রায় ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন কৃষক উপকৃত হয়েছেন বলে সরকারের মূল্যায়নে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে প্রথম ছয় মাসে ৬৭ হাজার ২৭৮টি ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে অন্তত ৪১ লাখ নারীকে এই কার্ড দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ৪৩ লাখ কৃষকের জন্য কৃষক কার্ড চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
এই কর্মসূচিগুলোর রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। কারণ এগুলো সফল হলে প্রচলিত প্রশাসনিক সহায়তার বদলে নাগরিকের কাছে সরাসরি রাষ্ট্রীয় সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার একটি নতুন কাঠামো তৈরি হতে পারে।
পানি ও পরিবেশ: মাঠপর্যায়ে বড় কর্মযজ্ঞ
পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনায়ও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যের কথা জানিয়েছে সরকার।
২০২৬ সালে প্রায় ৫ কোটি ১৫ লাখ চারা রোপণের লক্ষ্যের মধ্যে প্রথম ১৮০ দিনে ২ কোটি ২২ লাখ ৬৮ হাজার চারা রোপণের দাবি করা হয়েছে।
আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১ থেকে ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে ২ হাজার ১৬৫ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের তথ্য দেওয়া হয়েছে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদের দাবি, ১৮০ দিনের নির্ধারিত খাল খনন লক্ষ্যমাত্রা ১০২ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে এবং বৃক্ষরোপণেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি কাজ হয়েছে।
তবে খাল খননের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে খননের পর পানি প্রবাহ, কৃষি, জলাবদ্ধতা নিরসন ও স্থানীয় পরিবেশে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের ওপর।
আইনশৃঙ্খলা: দ্রুত বিচারকে বড় অর্জন হিসেবে দেখছে সরকার
আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে প্রথম ছয় মাসের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে দেখিয়েছে সরকার।
রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ১৯ দিনে এবং মেহেরপুরের শিশু ধর্ষণ মামলার রায় ২৯ কার্যদিবসে হওয়ার বিষয়টি দ্রুত বিচার ব্যবস্থার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও এপিবিএনের সমন্বিত অভিযানকেও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ বিভিন্ন হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার এবং বিদেশে অবস্থানরত আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের কথাও মূল্যায়নে রয়েছে।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিন পলাতক থাকা জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার এক আসামিকে গ্রেপ্তারের ঘটনাকে সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সীমান্তে পুশ-ইন ঠেকানো এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ে কঠোর অবস্থানও সরকারের নিরাপত্তা নীতির অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষণে নতুন কাঠামো
কারাগার, পুলিশ হেফাজত ও অন্যান্য আটককেন্দ্রে মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য ‘ন্যাশনাল প্রিভেন্টিভ মেকানিজম’ বিভাগ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় পূর্বঘোষণা ছাড়াই আটককেন্দ্র পরিদর্শনের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে।
বাস্তবায়িত হলে এটি আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার—দুই ক্ষেত্রেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন হতে পারে।
পররাষ্ট্রনীতিতে ‘ভারসাম্যের’ কূটনীতি
পররাষ্ট্রনীতিতে সরকার ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতিকে সামনে রেখেছে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো বড় শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে।
জুনে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকে সরকারের অন্যতম বড় কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সফরে ২০টির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতার বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
এখন বড় প্রশ্ন হলো এসব চুক্তি ও সমঝোতা বাস্তব প্রকল্প, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সুবিধায় কতটা রূপ নেয়।
শিক্ষা খাতে বড় বরাদ্দ, ডিজিটাল রূপান্তরের উদ্যোগ
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা করার কথা জানিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে ৪৩ দফা অগ্রাধিকার কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’, ফ্রি ওয়াই-ফাই, ডিজিটাল ক্লাসরুম, বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস ও ব্যাগ এবং উপবৃত্তি বৃদ্ধির মতো কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
সরকারের হিসাবে, ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির প্রাথমিক পর্যায়ের ২০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। পুরোনো ৬৫ হাজার ল্যাপটপ ও ৬২ হাজার মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর সংস্কারের মাধ্যমে ৮২ শতাংশ ক্লাসরুম সচল করার দাবিও করা হয়েছে।
শিক্ষার ক্ষেত্রে অবশ্য অবকাঠামোর পাশাপাশি শিক্ষার মান, শিক্ষক সংকট ও ডিজিটাল সুবিধার সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
স্বাস্থ্য খাতে মানবসম্পদ ও ডিজিটাল ব্যবস্থার পরিকল্পনা
স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসাসেবায় আস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য সামনে রেখে এক লাখ হেলথ কেয়ারার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তাদের ৮০ শতাংশ নারী হওয়ার কথা রয়েছে।
এর পাশাপাশি পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
হৃদরোগের স্টেন্ট, ভাল্ব, পেসমেকার, অক্সিজেনেটর ও ক্যানসার চিকিৎসার কিছু কাঁচামালের ওপর কর ও ভ্যাট কমানো বা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সব নাগরিকের জন্য ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ড চালুর লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ডেটা আর্কিটেকচার তৈরির কাজও শুরু হয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধা, জুলাই যোদ্ধা ও ধর্মীয় নেতাদের সহায়তা
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরশ্রেষ্ঠদের পরিবারের ভাতা বাড়ানোর পাশাপাশি জুলাই যোদ্ধাদের জন্যও ভাতা চালু হয়েছে।
সরকারের হিসাবে, গেজেটভুক্ত ১৪ হাজার ৩৬৮ জুলাই যোদ্ধার মধ্যে ১৩ হাজার ৪৭৯ জন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে মাসিক ভাতা পাচ্ছেন।
ধর্মীয় নেতাদের পরীক্ষামূলক সম্মানী কর্মসূচির আওতায় ১৩ হাজার ৯৪৯ জনকে ভাতা দেওয়ার তথ্যও মূল্যায়নে রয়েছে।
যে জায়গায় সবচেয়ে বেশি চাপ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
প্রথম ছয় মাসের অর্জনের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় অস্বস্তির জায়গা হয়ে উঠেছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত।
মার্চ ও এপ্রিলে জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির পর জুলাইয়ে গ্যাস সরবরাহে তীব্র ঘাটতি দেখা দেয়। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং শিল্পকারখানা, সার কারখানা ও সিএনজি স্টেশনগুলো সমস্যায় পড়ে।
কিছু শিল্পকারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটেছে।
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের বড় লক্ষ্য সামনে রেখে শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা তাই সরকারের অন্যতম জরুরি পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক সমালোচনাও আছে
সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে অর্জনের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিতর্কও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
বিএনপির নেতাদের এক বছরের চুক্তিতে ১১টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগ এবং দলীয় ব্যক্তিদের ১১টি সিটি করপোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে সমালোচনা হয়েছে।
অর্থাৎ ব্যক্তি ও দলকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে প্রাতিষ্ঠানিকতার যে বার্তা সরকার সামনে আনছে, সেই দাবির সঙ্গে প্রশাসনিক নিয়োগের বাস্তবতার সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ছয় মাসের হিসাব: অর্জন বনাম প্রতিশ্রুতি
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভীর দাবি, সরকার গঠনের প্রথম ছয় মাসে অধিকাংশ নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোথাও শতভাগ, আবার কোথাও ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত লক্ষ্য পূরণ হয়েছে।
তবে সরকারের নিজস্ব মূল্যায়নকে চূড়ান্ত সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখার আগে বাস্তব ফলাফল যাচাই প্রয়োজন। কারণ ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, এক কোটি কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কিংবা স্বাস্থ্য কার্ড—এসবের অনেকগুলোই এখনো বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে।
সামনে সরকারের সবচেয়ে বড় পাঁচ পরীক্ষা
ছয় মাসের অভিজ্ঞতার পর আগামী সময়ের জন্য সরকারের সামনে অন্তত পাঁচটি বড় চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট।
প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সুফল পূর্ণাঙ্গ হবে না।
দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থান সৃষ্টি। পাঁচ বছরে প্রায় এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জনে বড় ধরনের বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, জ্বালানি নিরাপত্তা। শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে গ্যাস ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
চতুর্থত, প্রাতিষ্ঠানিকতা বনাম দলীয় প্রভাব। প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব সিদ্ধান্তের সামঞ্জস্য বজায় রাখতে হবে।
পঞ্চমত, প্রতিশ্রুতির বাস্তব ফল। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, শিক্ষা সংস্কার ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা কত দ্রুত এবং কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে—সেটিই শেষ পর্যন্ত সরকারের জনপ্রিয়তা ও কার্যকারিতার বড় সূচক হবে।
শেষ কথা
বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসকে এক কথায় মূল্যায়ন করলে বলা যায় এটি ছিল ঘোষণা, কাঠামো তৈরি এবং বাস্তবায়নের সূচনা পর্ব।
সরকার একদিকে অর্থনীতি স্থিতিশীল করা, কর্মসংস্থান বাড়ানো, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার এবং প্রশাসনে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি, রাজনৈতিক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক এবং বড় বড় প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
ছয় মাসের সাফল্য তাই এখনো অনেকাংশে ‘কাজের তালিকা’র মধ্যে সীমাবদ্ধ। আগামী এক থেকে দুই বছরেই স্পষ্ট হবে—এই উদ্যোগগুলো সত্যিই রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন ধারা তৈরি করতে পারে কি না, নাকি এগুলো শেষ পর্যন্ত আরেক দফা ঘোষণার তালিকায় পরিণত হয়।

