রাজনীতি ডেস্ক:
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের চেয়ে জুলাইয়ের ইশতেহারকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী তাসনুভা জাবিন। তাঁর মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা বর্তমান সরকারের সাফল্য বিচার করতে হলে দলীয় নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে সরকারের অগ্রগতি দেখতে হবে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রম নিয়ে মূল্যায়ন করতে গিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
তাসনুভা জাবিনের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকার প্রচলিত রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় ক্ষমতায় আসেনি। তাঁর ভাষায়, পাঁচ বছর পরপর স্বাভাবিক নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় এই সরকার গঠিত হয়নি; বরং বহু মানুষের জীবন ও রক্তের বিনিময়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান সফল হওয়ার পর বর্তমান সংসদ ও সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এই বাস্তবতায় সরকারের ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের চেয়ে জুলাইয়ের ইশতেহার ও জুলাইয়ের প্রতিশ্রুতিই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
‘জুলাইয়ের চেতনা’ নয়, বাস্তব পরিবর্তনের প্রশ্ন
তাসনুভা বলেন, সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে জুলাইয়ের চেতনা ও প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ উঠলেই সেটিকে ‘জুলাইয়ের চেতনার ব্যবসা’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁর মতে, বিতর্কটি সেখানে নয়; মূল প্রশ্ন হলো গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্রব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের পথে কতটা এগোচ্ছে এবং সেই পরিবর্তনের প্রতি সরকারের প্রকৃত আগ্রহ কতটা।
এই জায়গাতেই তিনি সরকারের কার্যক্রমে হতাশা দেখিয়েছেন।
সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে কার্ড বিতরণ ও খাল খননের মতো কর্মসূচির প্রশংসা করলেও তাসনুভার মতে, সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের মৌলিক সংকটের তুলনায় এসব উদ্যোগ এখন গৌণ হয়ে পড়ছে। রান্নার গ্যাসের সংকট, বিদ্যুৎ না থাকা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে পরিবহন ব্যয় বাড়া, পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং একই সঙ্গে বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিলের চাপ এসব বাস্তবতায় মানুষের দুর্ভোগই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন
সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাসনুভা জাবিন। বিচার বিভাগ, পুলিশ, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও স্থানীয় প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তিনি এটিকে ‘ভীষণ হতাশার’ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।
তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, শুধু জনকল্যাণমূলক কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করলেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশিত রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্য পূরণ হয় না। বরং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কতটা নিরপেক্ষ ও কার্যকর করা যাচ্ছে, সেটিও সরকারের সাফল্য পরিমাপের অন্যতম মানদণ্ড হওয়া উচিত।
জ্বালানি নীতিতেও ‘নতুনত্ব’ খুঁজছেন তাসনুভা
দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের নীতির সমালোচনাও করেছেন এনসিপির সাবেক এই নেত্রী। তাঁর প্রশ্ন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক পরিকল্পনা কোথায়?
তাঁর অভিযোগ, একদিকে গ্যাস আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে, অন্যদিকে প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোকে সুবিধা দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে সরকারের নীতিতে কাঙ্ক্ষিত নতুনত্ব বা কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ কোথায় এমন প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
তাসনুভা স্বীকার করেন, দেশের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে সংকটের সময়ে সাধারণ মানুষকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সম্ভাব্য সমাধান সম্পর্কে আশ্বস্ত করা জরুরি। সেই জায়গায় দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার বদলে কার্ড বিতরণকে সামনে আনা তাঁর কাছে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।
ছয় মাসের হিসাব নিয়ে তাসনুভার বার্তা
তাসনুভা জাবিনের মতে, সরকারের ছয় মাসের সাফল্য পরিমাপের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কিছু কর্মসূচির চেয়ে রাষ্ট্র সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
পোস্টের শেষদিকে সরকারের উদ্দেশে তিনি পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনার আহ্বান জানান। তাঁর বার্তা ছিল মাত্র ছয় মাস অতিবাহিত হয়েছে; তাই এখনই পরিকল্পনা সংশোধন করে সরকারের অগ্রাধিকার নতুন করে নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে।
তাসনুভার এই বক্তব্য মূলত সরকারের প্রথম ছয় মাসের কার্যক্রম নিয়ে একটি রাজনৈতিক মূল্যায়ন। তাঁর দৃষ্টিতে, প্রশ্নটি কেবল সরকার কী কী কর্মসূচি নিয়েছে তা নয়; বরং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যে রাষ্ট্র পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সরকার সেই পরিবর্তনের পথে কতটা এগোতে পেরেছে সেটিই বড় হিসাব।

