বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ যোগাযোগ আমাদের পরিচয়
English
সর্বশেষ খুলনা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার আজকের নামাজের সময়সূচি ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ● নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এমপি হেলাল দিঘলিয়ার সারোয়ার খান কলেজ সরকারিকরণের উদ্যোগ ● বৃষ্টির শঙ্কায় বাংলাদেশ-চীন ম্যাচ, পরিত্যক্ত হলে সেমিফাইনালে বাংলাদেশ ● নতুন কুঁড়ির ৩০৬ প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদকে বিকেএসপিতে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ সরকারের ● ভূমি অফিসে হাজিরা নিশ্চিত করতে চালু হচ্ছে ‘ভূমিদৃষ্টি’ অ্যাপ
রাজনীতি

গুমের শিকার শিবিরের ২৪১ নেতাকর্মীর জন্য ন্যায়বিচার দাবি

রাজনীতি ডেস্ক:

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ২৪১ নেতাকর্মীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত, এখনো নিখোঁজ সাত নেতাকর্মীর সন্ধান এবং গুম ও হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। ‘গুম ও নিপীড়নের খতিয়ান: ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ ও গুম প্রতিরোধে কার্যকর সংস্কারের দাবি’ শীর্ষক এ সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির গুম, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য দেন ছাত্রশিবিরের নূরুল ইসলাম সাদ্দাম। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় গুমের শিকার হয়ে সংগঠনটির সাতজন নেতাকর্মী এখনো নিখোঁজ। তারা হলেন—ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মো. ওয়ালীউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাস, ঢাকা ডেন্টাল কলেজের হাফেজ জাকির হোসেন, বেনাপোলের রেজওয়ান হোসেন, বান্দরবানের জয়নাল হোসেন, ঝিনাইদহের মু. কামরুজ্জামান এবং কক্সবাজারের শফিকুল ইসলাম।

তার দাবি, এক যুগের বেশি সময় পার হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁদের আটক বা গ্রেপ্তারের কথা স্বীকার করেনি। ফলে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

সাত নেতাকর্মী নিখোঁজ

ছাত্রশিবিরের দাবি অনুযায়ী, ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে কুষ্টিয়াগামী বাসে করে ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে আশুলিয়ার নবীনগর থেকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন অর্থ সম্পাদক মো. ওয়ালীউল্লাহ ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক আল মুকাদ্দাসকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়।

২০১৩ সালের ২ এপ্রিল রাতে ঢাকার শ্যামলী রিং রোডের টিক্কাপাড়ার বাসা থেকে ছাত্রশিবিরের আদাবর থানা সভাপতি হাফেজ জাকির হোসেনকে সাদা পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে যান বলেও অভিযোগ করা হয়।

এ ছাড়া ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট বেনাপোলের দুর্গাপুর বাজার থেকে রেজওয়ান হোসেন, একই বছরের ২৩ অক্টোবর বান্দরবান সদর থেকে জয়নাল হোসেন, ২০১৭ সালের ৭ এপ্রিল ঝিনাইদহের লেবুতলা থেকে মু. কামরুজ্জামান এবং ৩০ অক্টোবর কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে শফিকুল ইসলামকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।

গুমের সংখ্যা সাত শতাধিক দাবি

নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, গুম বিষয়ক তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ছাত্রশিবিরের ২৪১ জন রয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।

তাঁর ভাষ্য, কমিশনে আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল করা তথ্যের বাইরেও অনেক ঘটনা রয়েছে। নিরাপত্তাহীনতা, ভয়, নির্যাতনজনিত মানসিক বিপর্যয় এবং দেশের বাইরে অবস্থানের কারণে অনেকে কমিশনে অভিযোগ করতে পারেননি। এ কারণে ছাত্রশিবিরের প্রকৃত গুমের সংখ্যা সাত শতাধিক বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটকের বিষয়টি স্বীকার করেনি। এতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার বছরের পর বছর তাঁদের স্বজনদের ভাগ্য সম্পর্কে অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকেছে।

‘ক্রসফায়ারে’ হত্যার অভিযোগ

সংবাদ সম্মেলনে গুমের পর কথিত ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ হত্যার অভিযোগও তুলে ধরা হয়। ছাত্রশিবিরের দাবি, অনেক নেতাকর্মীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর নির্যাতন করা হয় এবং পরে কথিত ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়।

এ প্রসঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাইদুল ইসলাম ও ছাত্রদল নেতা আতিকুর রহমানের ঘটনা তুলে ধরা হয়। সাদ্দামের দাবি, ২০১৪ সালের ১৩ জানুয়ারি ডিবি তাঁদের তুলে নেয়। পরে আতিকুর রহমানের লাশ পাওয়া যায় এবং মাইদুল ইসলামকে হত্যার পর বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। প্রায় ৫০ দিন পর তাঁর পরিবার বিষয়টি জানতে পারে বলে দাবি করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে মাইদুল ইসলামের ভাই শহিদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তাঁর ভাইকে গুম করে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর বাবা-মা দুজনই অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং শোক কাটিয়ে উঠতে না পেরে কিছুদিন পর তাঁর মা মারা যান বলেও তিনি জানান।

ছাত্রশিবিরের লিখিত বক্তব্যে আরও দাবি করা হয়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের হাতে সংগঠনটির অন্তত ১০১ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন।

এর মধ্যে আব্দুল্লাহ ওমর নাসিফকে ২০১৩ সালের ৪ মে মিরপুর থেকে র‍্যাব-২ তুলে নেওয়ার পর ১২ মে রাজশাহীতে কথিত ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয় বলে দাবি করা হয়। একইভাবে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সহকারী সাহিত্য সম্পাদক ইবনুল ইসলাম পারভেজকে ২০১৬ সালের ১৬ জুন সাদা পোশাকে তুলে নেওয়ার পর নির্যাতন করা হয় এবং ২ জুলাই ঝিনাইদহে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়।

নির্যাতনে পঙ্গুত্বের অভিযোগ

গুম ও হত্যার পাশাপাশি শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও করেছে ছাত্রশিবির। সংগঠনটির দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেক নেতাকর্মী স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।

এ প্রসঙ্গে জয়পুরহাট জেলা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি আবু জর গিফারী ও সেক্রেটারি ওমর আলীর ঘটনা উল্লেখ করা হয়। ২০১৫ সালের ৮ ডিসেম্বর র‍্যাব তাঁদের তুলে নেওয়ার পর বিভিন্ন ক্যাম্পে নির্যাতন এবং পরে পায়ে গুলি করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়। চিকিৎসায় অবহেলার কারণে তাঁদের পা কেটে ফেলতে হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়, বিগত সময়ে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ১৪ হাজার ৮২৬টি রাজনৈতিক ও ‘মিথ্যা’ মামলা করা হয়েছিল। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি বলেও দাবি করা হয়।

প্রস্তাবিত গুমবিরোধী আইন নিয়ে উদ্বেগ

সংবাদ সম্মেলনে প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ছাত্রশিবিরের নেতারা বলেন, গুমের অভিযোগে অভিযুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধেই যদি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

তাঁদের দাবি, তদন্তের দায়িত্ব এমন একটি স্বাধীন সংস্থার হাতে দিতে হবে, যার ওপর অভিযুক্ত কোনো বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব থাকবে না। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে নিজস্ব তদন্ত দল ও কার্যকর ক্ষমতা দেওয়ারও দাবি জানানো হয়।

ছয় দফা দাবি

সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—

১. গুম কমিশনে দায়ের করা ২৩৬ জন ছাত্রশিবির নেতাকর্মীসহ সাত শতাধিক গুমের ঘটনার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত;
২. এখনো নিখোঁজ সাত নেতাকর্মীর অবস্থান সম্পর্কে রাষ্ট্রের স্পষ্ট বক্তব্য;
৩. গুম ও হত্যার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিচার;
৪. ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ;
৫. গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনসহ সংশ্লিষ্ট আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন; এবং
৬. নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে পূর্ণ স্বাধীনতা ও কার্যকর ক্ষমতা দেওয়া।

সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের নেতারা বলেন, নিখোঁজ সাত নেতাকর্মীর পরিবার এখনো তাঁদের স্বজনদের ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছে। তাঁদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানানো এবং গুম ও হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান তাঁরা।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

একটি মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Notice: ob_end_flush(): Failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/modhumot/public_html/wp-includes/functions.php on line 5493