বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ যোগাযোগ আমাদের পরিচয়
English
সর্বশেষ খুলনা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার আজকের নামাজের সময়সূচি ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ● নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এমপি হেলাল দিঘলিয়ার সারোয়ার খান কলেজ সরকারিকরণের উদ্যোগ ● বৃষ্টির শঙ্কায় বাংলাদেশ-চীন ম্যাচ, পরিত্যক্ত হলে সেমিফাইনালে বাংলাদেশ ● নতুন কুঁড়ির ৩০৬ প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদকে বিকেএসপিতে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ সরকারের ● ভূমি অফিসে হাজিরা নিশ্চিত করতে চালু হচ্ছে ‘ভূমিদৃষ্টি’ অ্যাপ
রাজনীতি

জুলাই জাদুঘরকে দলীয় বয়ানের বাইরে রাখার আহ্বান নাহিদ ইসলামের

রাজনীতি ডেস্ক:

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস কোনো ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একক বয়ানে সীমাবদ্ধ না রেখে আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস সংরক্ষণ ও উপস্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরকে কেবল একটি স্মৃতিচারণের স্থান হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাস চর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সেখানে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও অঞ্চলের মানুষের ভূমিকা সমান গুরুত্বে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে।

শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে রাজধানীর গণভবনে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।

‘পরিচিত কয়েকটি মুখের মধ্যে ইতিহাস আটকে থাকা উচিত নয়’

জাদুঘরের বর্তমান প্রদর্শনী নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসের কিছু নির্দিষ্ট ঘটনা ও পরিচিত মুখ প্রদর্শনীতে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এর ফলে আন্দোলনের সামগ্রিক চিত্র অনেকটাই আড়ালে থেকে যাচ্ছে।

তার মতে, জুলাইয়ের ইতিহাস বুঝতে হলে শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহ নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘটিত আন্দোলন, প্রতিরোধ ও নিপীড়নের ঘটনাগুলোও ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরতে হবে।

বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ঢাকার বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণের পৃথক ইতিহাস সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

দল বদলের সঙ্গে ইতিহাসের বয়ান বদলানো যাবে না

জুলাই জাদুঘরে কোনো রাজনৈতিক দলের একক ইতিহাস দেখতে চান না বলে স্পষ্ট করেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চায় অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যবই ও ইতিহাসের বয়ান পরিবর্তনের নজিরও রয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসের ক্ষেত্রেও যেন একই ধরনের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

তার ভাষায়, জাদুঘরের ইতিহাস এমনভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এটিকে কোনো নির্দিষ্ট দলের ইতিহাস হিসেবে নয়, বরং দেশের মানুষের ইতিহাস হিসেবে দেখতে পারে।

বাদ পড়া ঘটনাগুলোও ইতিহাসের অংশ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনা ও বিতর্কিত অধ্যায় প্রদর্শনী থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম।

সীমান্ত হত্যা, ভারতবিরোধী আন্দোলনসহ আন্দোলনের সময়কার বিভিন্ন ঘটনার স্মৃতি ইতিহাসের অংশ হিসেবে যথাযথভাবে সংরক্ষণের দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে বিগত ১৬ বছরে দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের প্রতিরোধ এবং বিজয়ের ঘটনাগুলোও জাদুঘরে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

তিনি মনে করেন, কোনো ঘটনা ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ইতিহাস নির্মাণ করা সম্ভব নয়।

আবু সাঈদের স্মৃতি আরও দৃশ্যমান করার দাবি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রতীক শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতি নিয়েও কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।

জাদুঘরের বর্তমান প্রদর্শনীতে আবু সাঈদের ছবি না থাকার বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। জবাবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আবু সাঈদকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে এবং সেটি জাদুঘরে প্রদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এ ছাড়া শহীদদের পরিবারের কাছ থেকে সংগ্রহ করা স্মৃতিচিহ্নগুলোর আরও বড় একটি অংশ দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, এসব স্মৃতিচিহ্ন শুধু প্রদর্শনীর বস্তু নয়; এগুলো আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ইতিহাস বহন করে।

১৭ একর জায়গাকে কাজে লাগানোর পরামর্শ

গণভবনের প্রায় ১৭ একর জায়গাকে কাজে লাগিয়ে জাদুঘরের পরিসর আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম।

তার মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন পর্যায়ের ঘটনা, শহীদদের স্মৃতি, আন্দোলনের নিদর্শন, আলোকচিত্র ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে আলাদা আলাদা অংশে উপস্থাপন করা হলে দর্শনার্থীরা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারবেন।

জনবল সংকটে নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ

জাদুঘরের পরিচালন কাঠামো নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

নাহিদ ইসলাম জানান, বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর চাপ সামাল দিতে প্রায় ২০০ জন জনবল প্রয়োজন হলেও বর্তমানে মাত্র ১৫ থেকে ২০ জন কাজ করছেন। স্বল্প জনবলের কারণে আপাতত স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।

তার আশঙ্কা, দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের ব্যবস্থাপনা জাদুঘরের নিরাপত্তা ও দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি জাদুঘরের নিদর্শন ও ইতিহাস সম্পর্কে দর্শনার্থীদের যথাযথ তথ্য দিতে প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে।

আমলাতন্ত্র নয়, বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্বে পরিচালনার দাবি

জাদুঘর পরিচালনায় প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর পরিবর্তে ইতিহাস, গবেষণা, জাদুঘর ব্যবস্থাপনা ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, জাদুঘরকে স্বায়ত্তশাসিত কাঠামোয় পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা দরকার। আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থী, গবেষক, রাজনৈতিক কর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের যে ভূমিকা ছিল, জাদুঘরের পরিচালনা ও ইতিহাস সংরক্ষণে তাদের অভিজ্ঞতাকেও কাজে লাগানো উচিত।

তার মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও ইতিহাস সম্পর্কে যাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে একটি দক্ষ ও স্বাধীন ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ‘কার ইতিহাস’ সেটিই বড় প্রশ্ন

নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে মূলত উঠে এসেছে একটি প্রশ্ন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কার ইতিহাস হিসেবে সংরক্ষিত হবে?

তার মতে, এই ইতিহাস কোনো দলের, কোনো নেতার কিংবা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একক সম্পত্তি নয়। আন্দোলনের মাঠে থাকা শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ, বিভিন্ন পেশার নাগরিক, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ এবং শহীদ ও আহতদের পরিবার—সবার অভিজ্ঞতা মিলিয়েই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস তৈরি হতে পারে।

তাই রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে ইতিহাসের প্রদর্শনী বা বয়ান পরিবর্তনের পরিবর্তে তথ্য, দলিল, স্মৃতিচিহ্ন ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একটি নিরপেক্ষ ও বহুমাত্রিক ইতিহাস সংরক্ষণ করাই হবে জুলাই জাদুঘরের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

একটি মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Notice: ob_end_flush(): Failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/modhumot/public_html/wp-includes/functions.php on line 5493