ধর্ম ও জীবন ডেস্ক:
মুসলিম উম্মাহর কাছে ঈদে মিলাদুন্নবী একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উপলক্ষ। ইসলামের শেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জন্ম বা শুভাগমনকে স্মরণ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা দিনটি বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালন করেন।
‘ঈদ’ শব্দের অর্থ আনন্দ বা খুশি এবং ‘মিলাদ’ অর্থ জন্ম বা জন্মবৃত্তান্ত। এ দুটি শব্দের সঙ্গে ‘নবী’ যুক্ত হয়ে ‘মিলাদুন্নবী’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। মুসলিম সমাজে দিনটি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন, কর্ম, আদর্শ ও মানবতার শিক্ষা স্মরণের একটি বিশেষ উপলক্ষ হিসেবে বিবেচিত।
বাংলাদেশে দিনটি ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ নামে পরিচিত হলেও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি ভিন্ন নামে পরিচিত। কোথাও কোথাও দিনটিকে ‘নবী দিবস’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। এ উপলক্ষে বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান আলোচনা সভা, মিলাদ মাহফিল, কোরআন তেলাওয়াত, দরুদ ও সালাম পাঠ, দোয়া-মোনাজাত এবং মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শভিত্তিক নানা কর্মসূচির আয়োজন করে।
মহানবীর প্রতি ভালোবাসা ও অনুসরণের শিক্ষা
ইসলামে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর আদর্শ অনুসরণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবেসে থাকো, তবে আমাকে অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন।” — সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৩১।
অন্যত্র বলা হয়েছে, “তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসুলের আনুগত্য কর, তাহলে তোমরা দয়া প্রাপ্ত হবে।” — সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩২।
পবিত্র কোরআনের সূরা আহজাবের ২১ নম্বর আয়াতে মহানবী (সা.)-কে মানবজাতির জন্য উত্তম আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর জীবন ছিল সত্য, ন্যায়, দয়া, ক্ষমা, মানবতা, সহনশীলতা ও শান্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসার গুরুত্বও তুলে ধরা হয়েছে। মুসলমানদের কাছে তাঁর শিক্ষা ও সুন্নাহ অনুসরণ কেবল ধর্মীয় দায়িত্বই নয়, ব্যক্তি ও সমাজজীবনে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার অন্যতম পথ।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে করণীয়
বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা বহু বছর ধরে পবিত্র ‘১২ রবিউল আউয়াল’ দয়াল নবীজির পবিত্র বেলাদত (শুভাগমন) দিবস উপলক্ষে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে মিলাদুন্নবী, জশনে-জুলুস ইত্যাদি পালন করে আসছে, যা শরিয়তের দৃষ্টিতে বেদায়াতে হাছানা ও মোস্তাহাব। উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হুজুর (সা.)-এর প্রতি যথাযোগ্য সম্মান, দরুদ ও সালাম পেশ করা অতি উত্তম ইবাদত। প্রিয় নবী (সা.)-এর শুভাগমনে অকৃপণ ও বিশাল উদারতায় আনন্দ প্রকাশ করা আমাদের জন্য পরম কল্যাণকর। হাদিসে এসেছে। প্রিয়নবী (সা.)-এর জন্মের সংবাদ শুনে তাঁর চাচা আবু লাহাব তার দাসী সুরাইবাকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন।
হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর শুভাগমন স্মরণে খুশি প্রকাশ করে মিলাদ মাহফিলের ব্যবস্থা করা, কোরআন তেলাওয়াত, দরুদ শরিফ পাঠ, তাওয়াল্লুদ বা জন্মকালীন ঘটনা মজলিস করে আলোচনা করা, দাঁড়িয়ে সালাম, কাসিদা বা প্রশংসামূলক কবিতা, ওয়াজ-নসিহত, দোয়া-মোনাজাত, সম্ভব মতো মেহমান নেওয়াজির সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠান করা।
শান্তি ও মানবতার বার্তা
বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মানবজাতির জন্য শান্তি, সাম্য, ন্যায়বিচার ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দিয়ে গেছেন। তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে সমাজে হিংসা, বিদ্বেষ ও অন্যায় দূর করে পারস্পরিক ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব বলে ধর্মীয় চিন্তাবিদরা মনে করেন।
ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের প্রত্যাশা শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মহানবী (সা.)-এর সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমাশীলতা ও মানবপ্রেমের শিক্ষা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করা।
মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সর্বোত্তম মাধ্যম হলো তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ অনুসরণ করা। পবিত্র এই উপলক্ষ মুসলিম উম্মাহকে সেই আদর্শে উজ্জীবিত করে শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখবে এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে ইহকাল ও পরকালে কল্যাণ অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

