রাজনীতি ডেস্ক:
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে বিএনপির দুইটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহকে ঘিরে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির পক্ষ থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হলেও, দলটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। ফলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রার্থী নিয়ে কৌতূহল থাকছে রাজনৈতিক মহলে।
তবে বিএনপির একাধিক উচ্চপর্যায়ের সূত্রের দাবি, দলের মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও দলের ভেতরের প্রস্তুতি অনেকটাই সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইসি সূত্র বলছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একই ব্যক্তির নামে একাধিক মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে একটি মনোনয়নপত্র বৈধ হলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বৈধ প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন। তাই বিএনপির দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেটি প্রার্থী হিসেবে দুই ব্যক্তির উপস্থিতি বোঝায় না।
শেষ মুহূর্তেই নাম প্রকাশ করবে বিএনপি
বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, দলের স্থায়ী কমিটি রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়টি দলের চেয়ারম্যানের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। এ কারণে আগে থেকে প্রার্থীর নাম ঘোষণা না করে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় বিষয়টি প্রকাশ্যে আনার কৌশল নিয়েছে দলটি।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র দাখিল করা যাবে। এরপর ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত হবে ভোট।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর ভাষ্য, অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন না হলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই হতে যাচ্ছেন দলটির প্রার্থী। এর আগে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্রও জানিয়েছে, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার নাম চূড়ান্ত করেছেন।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মির্জা ফখরুলের সম্মতিসূচক স্বাক্ষর বা লিখিত সম্মতিও নেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
বিরোধী জোটের প্রার্থী অলি আহমদ
অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। জোটের পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
ফলে বিএনপির পক্ষ থেকে মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন চূড়ান্ত হলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাবে।
৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মঞ্চে মির্জা ফখরুল
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল নতুন একটি সাংবিধানিক দায়িত্বের সম্ভাবনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৯৯১ সালে সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে এসেছে, আর এবার সেই নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবেই তাঁর নাম আলোচনার কেন্দ্রে।
রাজনীতিতে তাঁর আনুষ্ঠানিক উত্থান আরও আগে। ১৯৯২ সালে তিনি বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। একই সময়ে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
পরাজয় পেরিয়ে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষে
১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও জয় পাননি মির্জা ফখরুল। কিন্তু নির্বাচনী পরাজয় তাঁর রাজনৈতিক অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারেনি।
২০০১ সালের নির্বাচনে একই আসন থেকে আওয়ামী লীগের রমেশ চন্দ্র সেনকে পরাজিত করে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। এরপর বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় জায়গা পান। প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি মন্ত্রিসভায় ছিলেন।
ওয়ান-ইলেভেনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ও মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি বিএনপির অভ্যন্তরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে পরাজয়ের মুখোমুখি হলেও দলের সাংগঠনিক রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হয়েছে।
বিএনপির মহাসচিব থেকে রাষ্ট্রপতি ভবনের সম্ভাব্য প্রার্থী
২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে মির্জা ফখরুল সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। ২০১১ সালের মার্চে তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান।
এরপর ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। দীর্ঘ সময় ধরে দলটির গুরুত্বপূর্ণ এই পদে থেকে তিনি বিএনপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে আসছেন।
এবার সেই মির্জা ফখরুলের নামই রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সামনে এসেছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিলের দিনই পরিষ্কার হবে বিএনপির দুই মনোনয়নপত্রের আড়ালে থাকা চূড়ান্ত প্রার্থী কে। তবে দলীয় সূত্রগুলোর বক্তব্য এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রস্তুতি বলছে, সেই নামটি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।

