খুলনা ব্যুরো:
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে খুলনায় সবচেয়ে উত্তপ্ত দিনগুলোর একটি ছিল তথাকথিত ‘৩৪ জুলাই’। ওই দিন শান্তিপূর্ণ গণমিছিল ঘিরে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা ও পুলিশের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
টিয়ারশেল, রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জে অসংখ্য মানুষ আহত হন। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে পুলিশের একটি পিকআপে আগুন দেওয়া হয় এবং পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সহিংসতার মধ্যে একজন পুলিশ কনস্টেবল নিহত হন।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর দুপুর প্রায় ২টার দিকে খুলনা নিউ মার্কেট এলাকা থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা গণমিছিল শুরু হয়। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে মিছিলটি শান্তিপূর্ণভাবে গল্লামারী মোড়ের দিকে অগ্রসর হলে জিরোপয়েন্ট এলাকায় পৌঁছানোর পর পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই পুলিশ মিছিল লক্ষ্য করে টিয়ারশেল নিক্ষেপ শুরু করে। এতে মুহূর্তেই পুরো এলাকা উত্তেজনায় ফেটে পড়ে।
টিয়ারশেল নিক্ষেপের পর আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। উভয় পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দিলে আন্দোলনকারীদের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হয়ে পুলিশ একপর্যায়ে পিছু হটলে আন্দোলনকারীরা জিরোপয়েন্ট এলাকায় অবস্থান নেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল প্রায় ৪টার দিকে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে গেলে দ্বিতীয় দফা সংঘর্ষের সূচনা হয়। জিরোপয়েন্টে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের দুই দিক থেকে ঘিরে ফেলে পুলিশ। এরপর একের পর এক টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয় বলে অভিযোগ করেন আন্দোলনকারীরা। এতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন।
একই সময়ে আন্দোলনকারীদের আরেকটি অংশ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেয়। সেখানেও সাঁজোয়া যান নিয়ে অবস্থান নেয় পুলিশ। দীর্ঘ সময় ধরে দুই পক্ষের মধ্যে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করে। প্রায় এক ঘণ্টার সংঘর্ষের পর আন্দোলনকারীরা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করবে এমন আশ্বাসের ভিত্তিতে পুলিশ কিছুটা পিছু হটে। পরে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশ শেষে বিকেলে আন্দোলনকারীরা শিববাড়ী মোড়ের দিকে মিছিল নিয়ে এগোতে চাইলে আবারও পুলিশ বাধা দেয়। এতে একই দিনে তৃতীয় দফার সংঘর্ষ শুরু হয়। গল্লামারী এলাকা মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, পুলিশ এ সময় নির্বিচারে টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। পাল্টা হিসেবে আন্দোলনকারীরা ইটপাটকেল ছোড়েন। উত্তেজনার এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের একটি পিকআপে অগ্নিসংযোগ করে।
সংঘর্ষে এক পথচারীসহ অন্তত ছয়জন গুলিবিদ্ধ হন। সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত রাবার বুলেট ও শটগানের ছররায় আহত সাতজনসহ মোট ১৬ জনকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে এলে পুলিশ পিছু হটে এবং এলাকায় উত্তেজনা প্রশমিত হয়।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, সংঘর্ষের পর সিরাজুল ইসলাম, আবির, নীরব, নাবিল, মিজান, সৌরভ, আবদুল্লাহ, রায়েব সুলতানা রাইবা এবং রুবিনা ইয়াসমিনসহ একাধিক আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, আহতদের অনেকের শরীরে রাবার বুলেট ও শটগানের ছররা বিদ্ধ ছিল। সিরাজুল ইসলামের কপালে রাবার বুলেট আটকে গেলে জরুরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেটি অপসারণ করা হয়। এছাড়া আরও কয়েকজন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করেন।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পুরো দিনজুড়ে তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পরিকল্পিতভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে। তাদের দাবি, নির্বিচারে টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপের কারণে অসংখ্য শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারের কার্যালয় জানায়, দফায় দফায় সংঘর্ষের সময় দায়িত্ব পালনকালে খুলনা পুলিশ লাইন্সে কর্মরত কনস্টেবল সুমন কুমার ঘরামি (৩৩) নিহত হন। এছাড়া সংঘর্ষে ২০ থেকে ২৫ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানানো হয়।
দিনশেষে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের খুলনা মহানগর শাখার আহ্বায়ক আল শাহরিয়ার বলেন, দমন-পীড়ন কিংবা কারাগারের ভয় কোনো গণআন্দোলনকে থামাতে পারে না।
তিনি আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া নারী শিক্ষার্থীদের সাহসিকতার প্রশংসা করেন এবং গ্রেপ্তার এড়িয়ে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া শাম্মী ইসলামের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া আফসারি হাসান অপরূপা, হাফসা, স্নিগ্ধা, মুন্নিসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীর অবদানের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

