খুলনা প্রতিনিধি:
খুলনার ভৈরব নদের জেলখানাঘাট এলাকায় ফেরি ও যাত্রীবাহী ট্রলারের সংঘর্ষের পর নিখোঁজ মো. রাকিব খানের (২৮) সন্ধান পাঁচ দিনেও মেলেনি। দুর্ঘটনার আগে রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে সিসিটিভি ফুটেজে তাঁকে জেলখানাঘাটের দিকে যেতে দেখা গেলেও তিনি দুর্ঘটনাকবলিত ট্রলারে উঠেছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনার পর থেকেই তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোনও বন্ধ রয়েছে।
শনিবারও রাকিবের পরিবারের সদস্যরা ট্রলার ভাড়া করে ভৈরব নদের বিভিন্ন এলাকায় তাঁর সন্ধানে তল্লাশি চালান। তাঁরা নদীর দুই পাড় ধরে বটিয়াঘাটা পর্যন্ত খোঁজ করেন। তবে কোথাও রাকিবের সন্ধান না পেয়ে ফিরে আসেন। একমাত্র ছেলের নিখোঁজের ঘটনায় দিন যত যাচ্ছে, পরিবারের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ততই বাড়ছে।
গত মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) রাত পৌনে ১০টার দিকে খুলনার জেলখানাঘাট এলাকায় ফেরি ও যাত্রীবাহী একটি ট্রলারের সংঘর্ষ হয়। দুর্ঘটনার পর থেকেই রাকিব নিখোঁজ রয়েছেন বলে দাবি তাঁর পরিবারের। ওই রাত থেকেই তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরদিন ২ সেপ্টেম্বর রাকিবের নিখোঁজের ঘটনায় তাঁর মামা কামরুল হাসান খুলনা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
রাকিব খুলনার রূপসা উপজেলার আইচগাতী এলাকার বাসিন্দা। তাঁর বাবা বাকির খান ও মা রোক্সনা বেগম। পরিবারের সদস্যরা জানান, রাকিব প্রায় প্রতিদিন খুলনা শহরের বায়তীপাড়া আব্বাস উদ্দিন একাডেমিতে নাচ শিখতে যেতেন। ১ সেপ্টেম্বরও তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই দিন রাতে রাকিব তাঁর বন্ধু রাফিউল ইসলাম ও সজীব মণ্ডলের সঙ্গে দেখা করেন। রাত ৮টা ৫০ মিনিটের দিকে তাঁরা তিনজন সাউথ সেন্ট্রাল রোডের একটি চায়ের দোকানে যান। চা খাওয়ার পর রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাফিউল ও সজীব রাকিবকে বিদায় দিয়ে বাড়ির উদ্দেশে চলে যান।
এরপর রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে রাকিবকে জেলখানাঘাটের দিকে যেতে দেখা যায়। ওই সময় তাঁর পরনে ছিল টি-শার্ট ও থ্রি-কোয়ার্টার এবং হাতে ছিল মুঠোফোন। এরপর তাঁর আর কোনো গতিবিধির তথ্য পাওয়া যায়নি।
রাকিবের এক বন্ধু জানান, রাত ৯টা পর্যন্ত তাঁরা কয়েকজন একসঙ্গে ছিলেন। পরে রাকিবকে বিদায় দিয়ে তাঁরা চলে যান। কিছুক্ষণ পর থেকেই রাকিবের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে রাকিবের মা তাঁর বন্ধুদের ফোন করে জানান, রাকিব তখনো বাড়ি ফেরেননি।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ছেলের সন্ধানে কান্নায় ভেঙে পড়েন রাকিবের মা। তিনি বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব সামলাতে রাকিব অনেক পরিশ্রম করছিলেন। নৌযান চলাচলে অব্যবস্থাপনা ও চালকের গাফিলতির কারণে তাঁর ছেলে নিখোঁজ হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
রাকিবের মামা কামরুল ইসলাম বলেন, শনিবার সকালে তাঁরা ট্রলার ভাড়া করে বটিয়াঘাটা পর্যন্ত খোঁজ চালান। যাওয়ার সময় নদীর এক পাশ এবং ফেরার সময় অন্য পাশ ধরে তল্লাশি করেন। নদীতে থাকা জেলেদেরও রাকিবের ছবি ও পরিবারের যোগাযোগের নম্বর দেওয়া হয়েছে। তাঁরা রাকিবের সন্ধান পেলে পরিবারকে জানাবেন বলে জানিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাকিবকে পাওয়া গেছে—এমন কোনো তথ্য ছড়ানোর বিষয়ে কামরুল ইসলাম বলেন, এসব গুজব। রাকিবকে পাওয়া গেলে গণমাধ্যমকে জানানো হবে।
রূপসা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. আবুল খায়ের বলেন, শনিবার রাত পর্যন্ত রাকিবের সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। শনিবারও নদীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নেওয়া হয়েছে।
খুলনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, রাকিবের মা সকালে তাঁর কাছে এসে ছেলের সন্ধানের বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত রাকিবের উদ্ধারের কোনো তথ্য তাঁর কাছে নেই।
এদিকে নৌপুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে ৩০ থেকে ৩৫ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। পরে তাঁদের উদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমানে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন কোনো নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্য তাদের কাছে নেই। তবে রাকিবের পরিবার তাঁকে না পাওয়ায় নদীতে নৌপুলিশের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
খুলনা বিভাগের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক মো. মাসুদ সরদার বলেন, স্থানীয়দের সহযোগিতায় উদ্ধার অভিযান চালানো হয়েছে। তবে দুর্ঘটনায় ডুবে যাওয়া ট্রলারটি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
নৌপুলিশের কেএমপি সদর নৌ থানার সাব-ইনস্পেক্টর রবিউল ইসলাম বলেন, নদীতে ভাটির দিকে তীব্র স্রোত রয়েছে। এ কারণে নৌপুলিশ স্পিডবোট নিয়ে নদীতে নজরদারি করছে। কারও স্বজন নিখোঁজ থাকলে দ্রুত নৌপুলিশকে জানানোর জন্য তিনি অনুরোধ করেন।
রাকিবের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তাঁর সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা নদীতে তল্লাশি চালিয়ে যেতে চান। একই সঙ্গে রাকিবের নিখোঁজের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অনুসন্ধানও অব্যাহত রয়েছে।

