খুলনা প্রতিনিধি:
খুলনা নগরীর আড়ংঘাটা এলাকায় জনবসতির মধ্যে গড়ে ওঠা একটি শিল্পকারখানার বিরুদ্ধে শব্দ, বায়ু ও আলো দূষণসহ পরিবেশগত নানা অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ‘ই-শানা ননওভেন ফেব্রিক্স লিমিটেড’ নামের কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রমের কারণে দিন-রাত বিকট শব্দ ও গরম বাতাস সৃষ্টি হচ্ছে। এতে আশপাশের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
এ ঘটনায় স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা জেলা কার্যালয় থেকে কারখানা কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার লিখিত নোটিশ দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত ৭ সেপ্টেম্বর জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক হারুন-অর-রশীদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আড়ংঘাটা থানাধীন বাইপাস সড়কের পাশে তেলিগাতী দক্ষিণপাড়া এলাকায় জনবসতির মধ্যে কারখানাটি স্থাপন করা হয়েছে। কারখানার মেশিন ও জেনারেটরের শব্দ এবং রাতের তীব্র আলোয় আশপাশের বাসিন্দাদের ঘুম ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালু করে আরও বিকট শব্দ ও কম্পন সৃষ্টি করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
অভিযোগকারীরা আরও জানান, কারখানাটি স্থাপনের আগে ওই এলাকায় দুটি বড় পুকুর ছিল। স্থানীয়দের দাবি, মৃত হাবিবুর রহমান ও মৃত অমূল্য মণ্ডলের মালিকানাধীন ওই পুকুর দুটি ভরাট করে এবং আশপাশের জমি ভরাটের মাধ্যমে কারখানাটি গড়ে তোলা হয়েছে। এতে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কৃষিজমি কমে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ তাঁদের।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, শিল্পকারখানার কার্যক্রমের কারণে কৃষিজমি ও বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁরা কারখানাটির পরিবেশগত ছাড়পত্র, জমির ব্যবহার, শব্দ ও বায়ুদূষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সরেজমিন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। অভিযোগপত্রে স্থানীয় বাসিন্দা ডা. মনোরঞ্জন মণ্ডল, স্বপন মণ্ডল ও জয়নাল আবেদীন স্বাক্ষর করেছেন।
বেলার বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, পুকুর ভরাট করে জনবসতি এলাকায় শিল্পকারখানা গড়ে তোলার নিয়ম নেই। এর সঙ্গে শব্দ, আলো ও বায়ুদূষণ যুক্ত হলে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক। পরিবেশের ক্ষতি করে এমন কার্যক্রম বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে কারখানাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাফতুন মনোজ তা অস্বীকার করে বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরা কারখানা পরিদর্শন করে কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁরা সেগুলো বাস্তবায়নের কাজ করছেন। শব্দদূষণ কমানোর জন্য তাঁরা ছয় মাস সময় চেয়েছেন। তাঁর দাবি, প্রতিষ্ঠানটিতে এলাকার প্রায় ৮০০ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে।
এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সরদার শরিফুল ইসলামসহ একটি দল কারখানাটি পরিদর্শন করে। পরিদর্শনে শব্দ ও বায়ুদূষণের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে অধিদপ্তর।
সরদার শরিফুল ইসলাম বলেন, কারখানাটির পাশের একটি বাড়িতে ৭৫ ডেসিবল শব্দ রেকর্ড করা হয়েছে। এটি নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে ১৫ ডেসিবল বেশি। শব্দদূষণ কমানোর জন্য কারখানা কর্তৃপক্ষকে তিন দফা নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সর্বশেষ নোটিশে বলা হয়েছে, তেলিগাতী গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে কারখানার মেশিন ও জেনারেটরের তীব্র ও লাগাতার শব্দ এবং এক্সস্ট ফ্যানের গরম বাতাসে বসবাস অসহনীয় হয়ে ওঠার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরেজমিন পরিদর্শন ও শব্দ পরিমাপে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথাও নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
নোটিশে আরও বলা হয়, অনুমোদন ছাড়া প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো সম্প্রসারণের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে এবং জেনারেটর আবদ্ধ বা সাউন্ডপ্রুফ কক্ষে স্থাপনসহ শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে কারখানা কর্তৃপক্ষকে ৪৫ কর্মদিবস সময় দেওয়া হয়েছে। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত কারখানার উত্তর ও পূর্ব দিকের সব জানালা ও এক্সস্ট ফ্যান বন্ধ রাখারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নোটিশে সতর্ক করা হয়েছে।

