স্পোর্টস ডেস্ক:
বিশ্বকাপের মঞ্চে যখন লিওনেল মেসি দেশের হয়ে লড়ছিলেন, তখনই জানা গিয়েছিল জীবনের আরেক কঠিন লড়াইয়ে রয়েছেন তার বাবা হোর্হে মেসি। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই শেষে শেষ পর্যন্ত হার মানলেন তিনি। শনিবার আর্জেন্টিনার রোজারিওতে নেমে আসে শোকের ছায়া। ৬৮ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান মেসির বাবা।
ফুটবলার হিসেবে মেসির উত্থানের গল্পে মাঠের বাইরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন হোর্হে। ছেলের প্রতিভা বিকশিত হওয়ার শুরু থেকে পেশাদার ক্যারিয়ারের নানা বাঁকে তিনি ছিলেন পাশে। কখনো অভিভাবক, কখনো পরামর্শদাতা, আবার দীর্ঘ সময় মেসির এজেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তাই বাবাকে হারানোর এই মুহূর্তটি মেসির জন্য শুধু একজন স্বজনকে হারানোর নয়, বরং জীবনের দীর্ঘ পথের এক নির্ভরতার জায়গা হারানোরও।
স্থানীয় সময় শুক্রবার দিবাগত রাত প্রায় ২টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হোর্হে মেসি। তার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন তিনি।
বাবার মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে আর্জেন্টিনার উদ্দেশে রওনা দেন মেসি। স্থানীয় সময় শনিবার রাত ৮টা ৪০ মিনিটে রোজারিওতে পৌঁছান আর্জেন্টাইন তারকা। বিমানবন্দর থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে একটি ভ্যানে করে বেরিয়ে যান তিনি। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো ও সন্তানরা।
হোর্হে মেসির শেষকৃত্য হবে রোজারিওর পাশের শহর পেরেজে। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আয়োজনটি রাখা হচ্ছে একেবারেই ব্যক্তিগত পরিসরে। পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনদের উপস্থিতিতেই সম্পন্ন হবে শেষবিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা।
তবে প্রিয় তারকার বাবাকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে কবরস্থানের সামনে ইতোমধ্যেই জড়ো হয়েছেন অসংখ্য ভক্ত। মেসির জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে তার পরিবারের প্রতি সমর্থন জানাতেই সেখানে উপস্থিত হয়েছেন তারা।
বাবার সঙ্গে মেসির সম্পর্ক ছিল শুধু পারিবারিক বন্ধনে সীমাবদ্ধ নয়। শৈশব থেকেই ছেলের ফুটবল-স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন হোর্হে। মেসির ক্যারিয়ারের উত্থান, ইউরোপে পাড়ি দেওয়া এবং পরবর্তী পেশাগত পথচলায়ও বাবার উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও হোর্হে বরাবরই ছেলের সাফল্যের আড়ালে থাকা মানুষ হিসেবেই নিজেকে রেখেছেন।
বাবার শেষযাত্রায় অংশ নিতে মেসির রোজারিও সফরের কারণে তার ক্লাব ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের সূচিত ম্যাচেও পরিবর্তন এসেছে। ইন্টার মায়ামির হয়ে লিগস কাপের গ্রুপ পর্বে মন্টেরির বিপক্ষে ম্যাচে মেসির খেলার কথা থাকলেও পারিবারিক শোকের কারণে তাকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। শেষকৃত্য শেষে কবে তিনি মায়ামিতে ফিরবেন, সে বিষয়ে ক্লাবের পক্ষ থেকে দ্রুত ফেরার কোনো চাপ দেওয়া হয়নি।
হোর্হে মেসির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শোকবার্তায় ভরে ওঠে ফুটবলবিশ্ব। মেসির দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই মানুষটির মৃত্যুতে সমবেদনা জানিয়েছে তার সাবেক ক্লাব বার্সেলোনা, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদসহ বিভিন্ন ক্লাব ও সংগঠন। মেসির শৈশবের শহর রোজারিওর ক্লাবগুলোও জানিয়েছে গভীর শোক।
বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলারের অসংখ্য অর্জনের গল্পে ট্রফি, রেকর্ড আর গোলের হিসাব থাকে। কিন্তু সেই গল্পের নেপথ্যে ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি খ্যাতির আলো থেকে দূরে থেকে ছেলের পাশে থেকেছেন বছরের পর বছর সেই মানুষটিই হোর্হে মেসি।
এবার মেসির জীবনের সেই দীর্ঘ পথচলার সঙ্গীকে শেষ বিদায় জানানোর পালা। ফুটবল মাঠে কোটি মানুষের ভালোবাসা পাওয়া মেসি আজ নিজ শহরে দাঁড়িয়ে কেবল একজন তারকা নন তিনি একজন শোকাহত সন্তান।

