স্পোর্টস ডেস্ক:
ফুটবল মাঠে অসংখ্য কঠিন মুহূর্ত পার করেছেন লিওনেল মেসি। শিরোপা হারানোর হতাশা, সমালোচনার চাপ কিংবা ক্যারিয়ারের চরম অনিশ্চয়তা সবকিছুর মধ্যেই পাশে পেয়েছেন বাবাকে। কিন্তু সেই নির্ভরতার জায়গাটিই যখন চিরতরে হারিয়ে গেল, তখন মেসির সামনে যেন অন্যরকম এক শূন্যতা।
বাবার মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় নিজের সেই শূন্যতার কথা জানিয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। সেখানে বাবাকে হারানোর কষ্টের পাশাপাশি ফুটবল ক্যারিয়ার চালিয়ে যাওয়া নিয়েও গভীর সংশয়ের কথা বলেছেন তিনি। আর তাতেই নতুন করে উঠেছে প্রশ্ন শেষের পথে কি সত্যিই এগিয়ে যাচ্ছেন ফুটবলের অন্যতম সেরা এই তারকা?
মেসির লেখায় স্পষ্ট, তাঁর বাবার সঙ্গে সম্পর্কটি শুধু বাবা-ছেলের ছিল না। ছিলেন বন্ধু, পরামর্শদাতা এবং ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর নেপথ্যের মানুষও। ছোটবেলা থেকে অনুশীলনে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে পেশাদার ফুটবলের দীর্ঘ পথ প্রায় প্রতিটি বাঁকেই বাবার উপস্থিতি ছিল তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মেসি লিখেছেন, বাবাকে ছাড়া সামনে কীভাবে এগোবেন, সেটিই এখন বুঝতে পারছেন না। তাঁর ভাষায়, ‘তুমি ছাড়া আমি কী করব জানি না, কীভাবে সামনে এগোব বুঝতে পারছি না।’ এরপরই আসে আরও তাৎপর্যপূর্ণ স্বীকারোক্তি ফুটবল খেলা চালিয়ে যাওয়া নিয়েই তাঁর মনে এখন যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় বাবার সঙ্গে শেষ বিশ্বকাপের স্মৃতির প্রসঙ্গটি। শেষবারের মতো বিশ্বকাপ খেলার জন্য বাবার জেদের কথা মনে করেছেন মেসি। বিশ্বকাপ জয়ের পর সেই ট্রফি বাবাকে দেখাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেই মুহূর্তটি আর ভাগ করে নেওয়া সম্ভব হয়নি। বাবার আরেকটু সময় বেঁচে থাকলে হয়তো একসঙ্গে সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি দেখতে পারতেন—এই আক্ষেপও ফুটে উঠেছে তাঁর কথায়।
মেসির ফুটবলার হয়ে ওঠার গল্পে তাঁর বাবার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও ছেলের অনুশীলন মিস না করার চেষ্টা করতেন তিনি। মেসি স্মরণ করেছেন, কাজ থেকে ফিরে ক্লান্ত শরীরেও তাঁকে অনুশীলনে নিয়ে যেতেন বাবা। কখনো কাজের কারণে সম্ভব না হলে মা দায়িত্ব নিতেন।
তবে মাঠের বাইরে মেসির কাছে বাবার গুরুত্ব আরও বিস্তৃত। নিজের ভাষায়, বাবা ছিলেন একই সঙ্গে ‘বাবা, বন্ধু এবং এজেন্ট’। জীবনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে মতপার্থক্য বা ছোটখাটো ঝগড়া হলেও শেষ পর্যন্ত বাবার কথাই সঠিক প্রমাণিত হয়েছে—এমন স্মৃতিও তুলে ধরেছেন তিনি।
বাবার কাছ থেকে পাওয়া মূল্যবোধ এখন নিজের সন্তানদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতে চান মেসি। বাবাকে হারানোর শোকের মধ্যেও সন্তানদের এমনভাবে বড় করার প্রত্যয় জানিয়েছেন, যেভাবে তিনি নিজে তাঁর বাবা-মায়ের কাছ থেকে শিক্ষা পেয়েছিলেন।
তবে মেসির এই বক্তব্যকে এখনই অবসরের ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তিনি কোনো নির্দিষ্ট অবসরের সময়সূচি জানাননি। বরং বাবাকে হারানোর পর গভীর মানসিক আঘাতের মুহূর্তে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, সেটিই প্রকাশ করেছেন।
তবু মেসির এই একটি স্বীকারোক্তিই বিশ্বজুড়ে তাঁর ভক্তদের ভাবিয়ে তুলেছে। যে মানুষটির ছায়ায় দাঁড়িয়ে মেসি হয়ে উঠেছেন ‘মেসি’, সেই মানুষটিই যখন আর পাশে নেই, তখন ফুটবল মাঠে তাঁকে আর কতদিন দেখা যাবে সেই প্রশ্নের উত্তর এখন সময়ের কাছেই।
বাবাকে হারানোর শোক হয়তো মেসির জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে তিনি কীভাবে ঘুরে দাঁড়ান, সেটিই এখন তাঁর ক্যারিয়ারের পরবর্তী অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় গল্প হয়ে উঠতে পারে।

