আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে ঘিরে ঢাকা-নয়াদিল্লির কূটনৈতিক তৎপরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। সফরের আনুষ্ঠানিক সূচি চূড়ান্ত হওয়ার আগেই কয়েকটি স্পর্শকাতর বিষয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ।
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হয়ে উঠেছে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণ এবং শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি।
কূটনৈতিক সূত্র ও ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য এই সফরের আগে দুই দেশের সম্পর্ককে একটি ‘অনুকূল পরিবেশে’ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা ঢাকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ শুধু শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক আয়োজন নয়, সফরের আগে কিছু দৃশ্যমান অগ্রগতিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ।
প্রত্যর্পণ ইস্যুই সামনে
ঢাকার আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ। মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ এর আগে বিভিন্ন পর্যায়ে তাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে এসেছে। চলতি আগস্টেও ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের নতুন প্রত্যর্পণ অনুরোধ প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও ঢাকার অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। এ মামলার আসামিদের বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের কথাও বাংলাদেশি কর্মকর্তারা আগে জানিয়েছিলেন।
দিল্লির রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে অস্বস্তি
ঢাকার উদ্বেগের আরেকটি জায়গা শেখ হাসিনার ভারত থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া। ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি করছে বলে মনে করছে ঢাকা।
বাংলাদেশের দৃষ্টিতে, একদিকে যখন নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক পুনর্গঠনের আলোচনা চলছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দিল্লি থেকে প্রকাশ্য বক্তব্য আসা সেই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে।
সফরের দরজা খোলা রাখছে দিল্লিও
অন্যদিকে ভারতও তারেক রহমানের সফর নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী জুলাইয়ের শেষ দিকে জানিয়েছিলেন, নয়াদিল্লি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছে।
এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান। সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় BRICS সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নেওয়ার জন্যও তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার প্রকাশ্যে জানিয়েছে।
শুধু সফর নয়, সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও হিসাব
তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর তাই কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে দেখছে না ঢাকা-নয়াদিল্লি। দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক আস্থা পুনর্গঠন, প্রত্যর্পণ, সীমান্ত, বাণিজ্য, ভিসা, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো একাধিক বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগে কিছু টানাপোড়েনের পাশাপাশি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টাও দেখা গেছে। ফলে সম্ভাব্য সফরটি হলে সেটি দুই দেশের সম্পর্ককে কোন পথে নেওয়া হবে তার একটি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করবে।
সব মিলিয়ে, দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ঢাকার আগ্রহ থাকলেও এবার সেই সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে পারস্পরিক স্বার্থ, আস্থা এবং দৃশ্যমান অগ্রগতিকে গুরুত্ব দিতে চাইছে বাংলাদেশ। ফলে তারেক রহমানের ভারত সফরের চূড়ান্ত সময়সূচির চেয়েও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সফরের আগে দিল্লি ও ঢাকা সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে কতটা সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে।

