আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছেন, যেখানে হরমুজ প্রণালীকে ‘New U.S. Territory’ বা ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর কয়েক দিন আগেই হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ১৪ আগস্ট এক বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, ইরানকে পরাজিত করার পর খুব শিগগিরই গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভূখণ্ড ঘোষণা করবেন। একইসঙ্গে তিনি দাবি করেছিলেন, সেখানে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ কার্যত যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অবস্থানে নিয়ে গেছে।
ট্রাম্পের সর্বশেষ মানচিত্র প্রকাশের পর অবশ্য প্রশ্ন উঠেছে এটি কি কেবল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল, নাকি সত্যিই হরমুজের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার ইঙ্গিত? এ বিষয়ে এখনো ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কোনো সুস্পষ্ট আইনি বা প্রশাসনিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই মুখোমুখি অবস্থান চলছে। জলপথটির নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে দুই দেশের অবস্থান বিপরীতমুখী। এরই মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক উদ্যোগও বড় ধরনের অচলাবস্থায় পড়েছে। ১৮ আগস্ট ট্রাম্প জানান, ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলমান নেই বা নির্ধারিতও হয়নি। অন্যদিকে তেহরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রণালী পুরোপুরি খুলে দেওয়ার প্রশ্ন নেই।
হরমুজ নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অবস্থানকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে তার আগের ধারাবাহিক হুমকি। গত ১২ আগস্ট তিনি দাবি করেছিলেন, হরমুজ প্রণালীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে এবং সেখানে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধকে তিনি ‘ইস্পাতের দেয়াল’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তবে ইরান ট্রাম্পের ভূখণ্ড ঘোষণার হুমকি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরানের কর্মকর্তারা বলেছেন, কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, সামরিক শক্তি কিংবা রাজনৈতিক ঘোষণার মাধ্যমে হরমুজের মালিকানা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। ইরানের দাবি, প্রণালীটি ইরান ও ওমানের উপকূলীয় জলসীমার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ নেই।
এদিকে হরমুজ সংকটের প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হওয়ায় প্রণালীতে অস্থিরতা বাড়লেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। ১৮ আগস্ট উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম তিন দিনের মতো ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯১ ডলারের ওপরে উঠে যায়।
ফলে ট্রাম্পের নতুন মানচিত্রকে ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটি কি ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর আরেকটি কৌশল, নাকি যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণকে তার মধ্যপ্রাচ্য নীতির স্থায়ী অংশে পরিণত করতে চাইছে? আপাতত এর স্পষ্ট উত্তর না মিললেও ট্রাম্পের সর্বশেষ পদক্ষেপ যে ওয়াশিংটন-তেহরান উত্তেজনাকে আরও তীব্র করেছে, তা নিয়ে সন্দেহ কম।

