আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
হরমুজ প্রণালিতে নতুন একটি সামুদ্রিক ট্রাফিক রুট চালুর বিষয়ে ওমানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর কাছাকাছি রয়েছে ইরান। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের বিকল্প নৌপথ ও এর আইনি কাঠামো নির্ধারণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে চলছে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
শনিবার (৮ আগস্ট) দেওয়া এক বক্তব্যে আরাগচি জানান, নতুন নৌপথ পরিচালনা, এর আইনি ভিত্তি এবং সামুদ্রিক চলাচলের কাঠামো নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে সম্ভাব্য সমঝোতা হলেও হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুরোপুরি চালুর বিষয়টি এখনও কয়েকটি শর্তের সঙ্গে যুক্ত।
ইরানের অবস্থান অনুযায়ী, জুনে স্বাক্ষরিত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কথিত লঙ্ঘনের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি এর মধ্যে অন্যতম। অর্থাৎ, শুধু ওমানের সঙ্গে নতুন নৌপথ নির্ধারণের সমঝোতা হলেই হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত হচ্ছে না।
পুরোনো নৌপথ ব্যবস্থায় আপত্তি, আলোচনায় বিকল্প রুট
ইরান দীর্ঘদিনের প্রচলিত নৌপথ বিভাজন ব্যবস্থাকে গ্রহণযোগ্য মনে করছে না। এর ফলে নতুন রুট নির্ধারণে কিছু প্রযুক্তিগত জটিলতা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আপাতত একটি অস্থায়ী সামুদ্রিক পথ চালুর বিষয়ে আলোচনা চলছে।
ইরানি কর্মকর্তাদের ধারণা, পরীক্ষামূলক বা অস্থায়ীভাবে চালু করা এই রুট ভবিষ্যতে স্থায়ী নৌপথে রূপ নিতে পারে। ফলে নতুন ব্যবস্থাটি শুধু বর্তমান সংকট মোকাবিলার উদ্যোগ নয়, বরং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ সামুদ্রিক চলাচল ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী—আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি বিষয়টিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি খোলার সিদ্ধান্ত মূলত ইরানের নিজস্ব শর্তের ওপর নির্ভর করছে এবং এটি ওমানের সঙ্গে চলমান আলোচনার সরাসরি অংশ নয়।
মোহেব্বি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নির্ধারিত শর্ত মেনে নিলেই প্রণালিটি পুনরায় উন্মুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পেছনে সামরিক উত্তেজনা ও স্থবির কূটনৈতিক আলোচনা
হরমুজ প্রণালি নিয়ে বর্তমান অচলাবস্থার পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর ইরান পাল্টা হামলা চালায়। এর পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক উদ্যোগ শুরু হয়।
১৮ জুন পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর কথা জানানো হলেও পরবর্তীতে পারস্য উপসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং পারস্পরিক শর্ত নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। এর ফলে আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
এখন ওমানের সঙ্গে নতুন নৌপথ নিয়ে ইরানের আলোচনা সেই বৃহত্তর সংকটের মধ্যেই নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে সমুদ্রপথ সচল রাখার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা খোঁজা হচ্ছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্তকে নিজেদের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত শর্তের সঙ্গে যুক্ত রাখছে তেহরান।
গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডর হরমুজ
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এই জলপথের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ফলে এখানে নৌ চলাচল নিয়ে যেকোনো অস্থিরতা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ওমানের সঙ্গে নতুন রুট নিয়ে সম্ভাব্য সমঝোতা তাই কেবল একটি নৌ-প্রযুক্তিগত উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এর সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের স্থিতিশীলতার বিষয়ও সরাসরি জড়িত।
চূড়ান্ত চুক্তি হলে নতুন সামুদ্রিক রুটটি হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের জন্য একটি বিকল্প কাঠামো তৈরি করতে পারে। তবে প্রণালির পূর্ণাঙ্গ উন্মুক্ততা শেষ পর্যন্ত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার শর্ত ও কূটনৈতিক সমঝোতার ওপরই নির্ভর করছে।

