বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ যোগাযোগ আমাদের পরিচয়
English
সর্বশেষ খুলনা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার আজকের নামাজের সময়সূচি ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ● নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এমপি হেলাল দিঘলিয়ার সারোয়ার খান কলেজ সরকারিকরণের উদ্যোগ ● বৃষ্টির শঙ্কায় বাংলাদেশ-চীন ম্যাচ, পরিত্যক্ত হলে সেমিফাইনালে বাংলাদেশ ● নতুন কুঁড়ির ৩০৬ প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদকে বিকেএসপিতে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ সরকারের ● ভূমি অফিসে হাজিরা নিশ্চিত করতে চালু হচ্ছে ‘ভূমিদৃষ্টি’ অ্যাপ
খুলনা বিভাগ

খুলনায় দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি, নগরজুড়ে আতঙ্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা:

একদিকে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে মশক নিধন কর্মসূচি, অন্যদিকে নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী মশার ঝাঁক। এর মধ্যেই খুলনায় দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, বাড়ছে হাসপাতালমুখী রোগীর চাপ। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যা নামলেই মশার উপদ্রব এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকাও অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।

প্রশ্ন উঠছে মশক নিধনে গত দুই বছরে ১৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হলেও মশা কমছে না কেন? আর মশার নিয়ন্ত্রণে এত অর্থ ব্যয়ের পরও কেন ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে?

নগরবাসীর অভিযোগ, শুধু ওষুধ ছিটানো ও ফগিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় কার্যকরভাবে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা যাচ্ছে না। ফলে একদিকে মশা নিধনের কার্যক্রম চলছে, অন্যদিকে ড্রেন-নালা, ময়লার স্তূপ ও জমে থাকা পানিতে নির্বিঘ্নে বংশবিস্তার করছে এডিস মশা।

ড্রেন-নালা থেকে পরিত্যক্ত পাত্র সবখানেই ঝুঁকি

নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক ড্রেন ও নালা দীর্ঘদিন ধরে অপরিষ্কার অবস্থায় রয়েছে। কোথাও জমে আছে ময়লা-আবর্জনা, কোথাও পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র কিংবা নির্মাণাধীন স্থাপনার আশপাশে বৃষ্টির পানি জমে রয়েছে।

বর্ষার পানিতে এসব স্থান এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বৃষ্টির পর জমে থাকা স্বচ্ছ পানির ছোট ছোট উৎসগুলো নিয়মিত অপসারণ না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

সন্ধ্যার পর নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মশার উপদ্রব আরও বেড়ে যায়। ঘরে মশারি, কয়েল কিংবা ইলেকট্রিক ব্যাট ব্যবহার করেও অনেক পরিবার স্বস্তি পাচ্ছে না।

‘দিন-রাত মশার অত্যাচারে অতিষ্ঠ’

নগরীর নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা মো. ইয়াহিয়া বলেন,
“দিন-রাত সমানতালে মশার অত্যাচার চলছে। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে সব সময় আতঙ্কে থাকতে হয়। মাঝে মধ্যে ওষুধ ছিটানো হলেও মশার সংখ্যা কমছে না।”

টুটপাড়া এলাকার গৃহিণী সুমনা মামুন বলেন,
“একটি জায়গায় কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকাও কঠিন হয়ে পড়েছে। মশার ঝাঁক ঘিরে ধরে। কেসিসি থেকে যে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে, তা যদি কার্যকর হয়, তাহলে মশার উৎপাত এত বেশি কেন?”

নিরালা এলাকার বাসিন্দা নেয়ামুল বারী হুজাইফার ভাষায়,
“ডেঙ্গুর রোগী বাড়ছে, মানুষের আতঙ্ক বাড়ছে; কিন্তু মশা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। শুধু মাঝে মধ্যে ফগিং করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।”

হাসপাতাল ভরছে ডেঙ্গু রোগীতে

মশার এমন বেপরোয়া উপদ্রবের মধ্যেই খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে নতুন করে প্রায় ২০০ জন ডেঙ্গু রোগী খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। জেলার অন্যান্য হাসপাতালেও একই সময়ে ভর্তি হয়েছেন আরও প্রায় ২৯৮ জন।

বর্তমানে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১২৫ জন ডেঙ্গু রোগী। সব মিলিয়ে খুলনা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন পাঁচ শতাধিক রোগী।

জ্বর, শরীর ব্যথা, দুর্বলতাসহ নানা উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিনই নতুন রোগী হাসপাতালে আসছেন। রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায়ও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

শুধু খুলনা নগরী নয়, পুরো খুলনা বিভাগেই ডেঙ্গুর বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। বাগেরহাট, যশোর, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন জেলায় রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর খুলনায় ডেঙ্গুতে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

চার ওয়ার্ড এখন ‘রেড জোন’

কেসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর ২২, ২৮, ২৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। এসব এলাকাকে ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ মশক নিধন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

কেসিসি বলছে, রেড জোনগুলোতে নিয়মিত ফগিং, লার্ভিসাইড প্রয়োগ, ড্রেন পরিষ্কার এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। নগরবাসীকেও নিজ নিজ বাড়ি, ছাদ, আঙিনা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে এবং কোথাও পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না।

১৫ কোটি টাকা ব্যয় ফল কোথায়?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন মশক নিধন কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে।

কেসিসির তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে মশক নিধনে ১৫ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হয়েছে। কিন্তু এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের পরও নগরবাসী মশার উপদ্রব থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না।

ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে এই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে? ব্যবহৃত ওষুধ কতটা কার্যকর? কোন এলাকায় কী ধরনের মশা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে? নিয়মিত কার্যক্রমের ফলাফল মূল্যায়ন করা হয়েছে কি না?

নগরবাসীর অভিযোগ, শুধু ফগিংকে মশক নিধনের প্রধান পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। কারণ পূর্ণবয়স্ক মশা মারার পাশাপাশি তাদের জন্মের উৎস ধ্বংস না করলে নতুন করে মশার বিস্তার ঘটতেই থাকবে।

তাদের মতে, ড্রেন-নালা পরিষ্কার, জমে থাকা পানি অপসারণ, পরিত্যক্ত পাত্র ধ্বংস, নির্মাণাধীন ভবন পর্যবেক্ষণ এবং বাড়ি বাড়ি সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।

বর্ষা শেষে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা

চিকিৎসকদের আশঙ্কা, বর্ষা শেষে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সুজাত আহমেদ বলেন, বর্ষা শেষে ডেঙ্গু রোগীর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মশক নিধনের পাশাপাশি নগরীর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, জ্বর, শরীর ব্যথা, দুর্বলতাসহ ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ফগিং নয়, প্রয়োজন সমন্বিত অভিযান

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু ফগিং যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, কার্যকর লার্ভিসাইড ব্যবহার, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ এবং জনসচেতনতা সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা।

খুলনায় এখন সেই সমন্বিত উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

একদিকে হাসপাতালের শয্যায় বাড়ছে রোগীর সংখ্যা, অন্যদিকে নগরবাসী সন্ধ্যা নামলেই মশার আক্রমণ থেকে বাঁচতে ঘরে আশ্রয় নিচ্ছেন। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যদি পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তাহলে শুধু নতুন কর্মসূচি ঘোষণা নয় পুরো মশক নিধন ব্যবস্থার পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও ব্যয়ের কার্যকারিতা খতিয়ে দেখার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের এখনই সময়। কারণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার পর পদক্ষেপ নিলে, তার মূল্য দিতে হতে পারে মানুষের জীবন দিয়ে।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

একটি মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Notice: ob_end_flush(): Failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/modhumot/public_html/wp-includes/functions.php on line 5493