খুলনা প্রতিনিধি:
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, পৃথিবীতে নবী-রাসুলদের আগমন, আসমানি কিতাব ও মিজান বা মানদণ্ড দেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সমগ্র মানবজাতিকে সুবিচার ও ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত করা। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য নৈতিক শিক্ষা ও আদর্শের পাশাপাশি শক্তি ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাও প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রোববার (৩০ আগস্ট) সকালে খুলনা নগরীর আল ফারুক সোসাইটি মিলনায়তনে খুলনা মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে আয়োজিত ‘সীরাতুন্নবী (সা.) সিম্পোজিয়াম-২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আদম (আ.) থেকে শুরু করে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত অসংখ্য নবী-রাসুলকে আল্লাহ তাআলা মানুষের হেদায়েতের জন্য পাঠিয়েছেন। তাঁদের কাছে সুস্পষ্ট বয়ান বা বায়্যেনাহ, কিতাব ও মিজান দেওয়া হয়েছে। মিজান অর্থ মানদণ্ড। সাধারণভাবে এর বাংলা অর্থ দাঁড়িপাল্লা হলেও এখানে ভালো-মন্দ, হালাল-হারাম, ইনসাফ-জুলুম, ন্যায়-অন্যায় এবং সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের মানদণ্ড বোঝানো হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এই মানদণ্ডের চূড়ান্ত রূপ হলো আল কুরআন।
সূরা হাদীদের ২৫ নম্বর আয়াতের ‘লিইয়াকুমান নাসু বিল কিসত’ অংশের ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘কিসত’ অর্থ সুবিচার বা ইনসাফ এবং ‘নাস’ অর্থ মানুষ। এখানে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে বোঝানো হয়নি; বরং সমগ্র মানবজাতিকে বোঝানো হয়েছে। সব মানুষ যেন সুবিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, সে কারণেই বায়্যেনাহ, কিতাব, রাসুল ও মিজান পাঠানো হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ প্রসঙ্গে জামায়াতের এই নেতা বলেন, শুধু রবিউল আউয়াল মাস এলেই সীরাত আলোচনা যথেষ্ট নয়। বছরের ১২ মাসই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন, দর্শন, আইন, বিধান ও আদর্শ নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে ‘উসওয়াতুন হাসানাহ’ বা উত্তম আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই একটি মাসে সীরাত আলোচনা করে বছরের বাকি সময় নবীর আদর্শ ভুলে থাকলে তাঁর জীবন থেকে প্রকৃত শিক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়। তাঁর ভাষায়, “উত্তম আদর্শ তো আর শুধু এই এক মাসে নয়, ১২ মাস। ১২ মাসেও যদি আদর্শের চর্চা না হয়, আদর্শের জ্ঞান না হয়, আদর্শের ক্লাস না হয়, তাহলে আমি কী করে নবীর আদর্শের রূপ দেব?”
ইনসাফ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় শক্তির সম্পর্ক তুলে ধরে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, হাদীদ বা লোহা শক্তির প্রতীক। লোহা দিয়ে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরি হয়। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় শক্তির প্রয়োজন রয়েছে। রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি ঠিক রাখা এবং সমাজে আইন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে, একই সঙ্গে মানুষের কল্যাণও নিশ্চিত করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মক্কি জীবনের সংগ্রামের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, নবুওয়াত লাভের আগে ৪০ বছর, নবুওয়াতের পর মক্কায় ১৩ বছর এবং মদিনায় ১০ বছর—মোট ৬৩ বছরের জীবন ত্যাগ, সংগ্রাম ও পরীক্ষায় পূর্ণ ছিল।
তিনি বলেন, মক্কার ১৩ বছরের সংগ্রামের সময়ে সাহাবিরা নির্যাতন সহ্য করেছেন। অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে হিজরত করেছেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল আল্লাহর একত্ববাদ, হেদায়েত, কিতাব ও মিজানের শিক্ষা মানুষের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করা।
শিআবে আবি তালিবে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর পরিবারের অবস্থানের ঘটনাও তুলে ধরেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, মক্কার কাফেররা রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বন্ধ করে দিয়েছিল। খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ বন্ধ থাকায় তাঁদের চরম কষ্টের মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছে।
মেরাজের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ঘটনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) জান্নাত, জাহান্নাম, আসমান এবং বিভিন্ন নবীর সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। এর মাধ্যমে তাঁর মধ্যে নতুন আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তা তৈরি হয় এবং তিনি দাওয়াত ও সংগ্রামের পথে আরও শক্তভাবে এগিয়ে যান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগরী আমীর মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান। সঞ্চালনা করেন মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শাহ আলম।
সিম্পোজিয়ামে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সহসভাপতি ও খুলনা অঞ্চল জামায়াতের টিম সদস্য মাস্টার শফিকুল আলম, জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও খুলনা জেলা আমীর মাওলানা এমরান হুসাইন, খুলনা নেছারিয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুর রহমান, শিক্ষাবিদ ড. শাহ আলম, সাবেক উপসচিব স ম আবু তালেব, খুলনা মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহিল গালিব এবং ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা আব্দুল গফ্ফার।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন মহানগরী নায়েবে আমীর অধ্যাপক নজিবুর রহমান, খুলনা জেলা সেক্রেটারি মুন্সী মিজানুর রহমান, মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি প্রিন্সিপাল শেখ জাহাঙ্গীর আলম ও আজিজুল ইসলাম ফারাজী, অফিস সেক্রেটারি মীম মিরাজ হোসাইন, প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি মুহাম্মদ আব্দুল গফুর, আইটি ও সমাজকল্যাণ সেক্রেটারি অধ্যাপক ইকবাল হোসেন, প্রকাশনা সেক্রেটারি মাওলানা শাহারুল ইসলাম, সার্বিয়ার সেক্রেটারি মাওলানা শেখ অলিউল্লাহ এবং ড. তহিরুল ইসলাম তোহা প্রমুখ।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আসমান, জমিন, কেয়ামত, জান্নাত ও জাহান্নাম—সবই সত্য। এই মহাসত্যের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে নবীর দেখানো পথে আহ্বান অব্যাহত রাখতে হবে।

