খুলনা প্রতিনিধি:
গুমের শিকার হয়ে যারা এখনও ফিরে আসেননি, অবিলম্বে তাঁদের স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মীরা। একই সঙ্গে গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ ও তাঁদের পরিবারকে পুনর্বাসন এবং কেউ জীবিত না থাকলে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁর পরিবারকে বিষয়টি অবহিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে রোববার (৩০ আগস্ট) খুলনায় আয়োজিত মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা এসব দাবি জানান। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর খুলনা ইউনিট খুলনা প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কে বেলা ১১টায় এ কর্মসূচির আয়োজন করে।
কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন ‘অধিকার’ খুলনা ইউনিটের ফোকালপার্সন সাংবাদিক মুহাম্মদ নূরুজ্জামান। তিনি ‘অধিকার’ প্রস্তুতকৃত দিবসের বিবৃতিও পড়ে শোনান।
বক্তারা বলেন, গুমের ঘটনায় ভুক্তভোগী ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। গুমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় দেশে আবারও গুমের সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
সমাবেশে মোংলায় মিরাজ শেখ নামে এক জেলে ও মোটরসাইকেল রাইডারকে কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে গুম করার যে অভিযোগ উঠেছে, তারও উল্লেখ করা হয়। বক্তারা এ ঘটনার দ্রুত, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। একই সঙ্গে মিরাজ শেখকে তাঁর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা।
বক্তারা বলেন, স্বাধীন দেশে গুমের বিরুদ্ধে রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে হবে—এমন পরিস্থিতি কাম্য নয়। গুমের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাঁরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
প্রস্তাবিত আইনের দুটি ধারা সংশোধনের দাবি
সমাবেশে প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর কয়েকটি ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বক্তারা জানান, গত ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬-এর খসড়া অনুমোদন করে। পরে ২৭ আগস্ট খসড়ায় কিছু পরিবর্তন এনে তা জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।
বক্তাদের অভিযোগ, খসড়ার ১৪(৩) ধারায় শৃঙ্খলা বাহিনী বা কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগের তদন্ত অভিযুক্ত বাহিনী নিজে করতে পারবে না বলা হলেও সরকার অন্য কোনো বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের ওপর তদন্তভার দিতে পারবে। তাঁদের মতে, পুলিশসহ কোনো শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গুমের অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলে তা নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া আইনের ২১ ধারায় তদন্তের মাধ্যমে কোনো অভিযোগ আদালতে মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার বিধান নিয়েও আপত্তি জানান বক্তারা। তাঁদের দাবি, এই বিধান ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারকে গুমের অভিযোগ করতে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
বক্তারা ১৪(৩) ও ২১ ধারা সংশোধন করে বিতর্কমুক্ত ও কার্যকর আইন প্রণয়ন এবং তা জাতীয় সংসদে পাস করার দাবি জানান।
তিন দফা দাবি
সমাবেশ থেকে তিন দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো—গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে না দিয়ে স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর তদন্তভার অর্পণ এবং তা আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা; গুমের পর এখনও ফিরে না আসা ব্যক্তিদের স্ত্রী-সন্তানদের ব্যাংক হিসাব পরিচালনা এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের আইনগত সুযোগ তৈরি করা; এবং গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা।
মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সহকারী মহাসচিব ও আমার দেশ-এর খুলনা ব্যুরো প্রধান এহতেশামুল হক শাওন, বিএফইউজের সাবেক সহসভাপতি ও মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন খুলনার সভাপতি মো. রাশিদুল ইসলাম, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক এসকে তাসাদুজ্জামান, গণসংহতি আন্দোলনের খুলনা জেলা শাখার যুগ্ম সদস্য সচিব আল-আমিন, খুলনা থানায় পুলিশের নির্যাতনের শিকার এসএম মাহমুদুল হক টিটো, মানবাধিকারকর্মী শেখ আব্দুল হালিম, খুলনা জেলা ব্লাড ব্যাংকের সভাপতি শেখ ফারুক, রোটারিয়ান সাখাওয়াত হোসেন স্বপন, মো. রফিকুল ইসলাম, মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট মো. শহিদুল ইসলাম, ‘অধিকার’-এর হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার মো. রায়হান মোল্লা, জি এম রাসেল ইসলাম, গুম থেকে ফিরে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. ইমরান হোসেন, সাংবাদিক মাসুম বিল্লাহ ইমরান, মিশারুল ইসলাম মনির, মানবাধিকারকর্মী হাফেজ মুহাম্মদ কামরুজ্জামান, স্নিগ্ধা সুলতানা মুন্নি ও নাবা আক্তার শারমিনসহ অনেকে।

