নিজস্ব প্রতিবেদক:
খুলনায় খুন, সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ ও র্যাব। বদলানো হয়েছে অভিযানের কৌশল, বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি। গত এক মাসে নগরী থেকে সাতটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধারের কথা জানিয়েছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি)। অন্যদিকে, সুন্দরবনে বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবে পাঁচ বাহিনীর প্রধানসহ ৫৯ জলদস্যু ও বনদস্যু আত্মসমর্পণ করেছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৫৯টি আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ।
র্যাব-৬-এর তথ্য অনুযায়ী, গত আট মাসে খুলনা অঞ্চলে ৬৩৪ জন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময়ে উদ্ধার হয়েছে ৪৬টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৯৫ রাউন্ড গুলি, ১৩টি ম্যাগাজিন এবং ৮৪টি বোমা ও ককটেল। একই সময়ে বিপুল পরিমাণ মাদকও জব্দ করা হয়েছে।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এসব তৎপরতার মধ্যেও থামছে না অপরাধ। নগরীতে একের পর এক হত্যাকাণ্ড, গুলিবর্ষণ, অপহরণের অভিযোগ ও গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—অভিযান, গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারের পরও খুলনার অপরাধজগতের শিকড় কেন পুরোপুরি উপড়ে ফেলা যাচ্ছে না?
নতুন কমিশনারের দায়িত্বের পরও জোড়া খুন
গত ২ আগস্ট কেএমপি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. সাজ্জাদুর রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর নগরীতে কয়েকটি আলোচিত অপরাধের ঘটনা ঘটে।
গত ১৯ আগস্ট লবণচরা থানার আশিবিঘা এলাকায় মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে নাজমুল ও মঞ্জুরুল ইসলাম নামে দুই যুবক খুন হন। এর আগের দিন, ১৮ আগস্ট রায়েরমহল এলাকায় চার বছরের শিশু মিমকে অপহরণের অভিযোগে রাজু নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এরপর ২৬ আগস্ট নগরীর টুটপাড়া এলাকায় মামুন মীর নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন। পরপর এসব ঘটনায় নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়।
তবে কেএমপি বলছে, এসব ঘটনার পরপরই অপরাধীদের ধরতে অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।
‘অভিযানের কৌশল বদলানো হয়েছে’
কেএমপি কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকেই নগরীতে পুলিশের অভিযানের ধরন ও কৌশলে পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি।
তিনি বলেন, এরই মধ্যে অভিযানের সুফল পাওয়া যাচ্ছে। গত এক মাসে নগরী থেকে সাতটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে।
কমিশনার জানান, ২৬ আগস্ট টুটপাড়ায় মামুন মীরকে গুলি করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দারোগাপাড়া এলাকায় অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে তিনটি বিদেশি পিস্তল, গুলি ও বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্রসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদারের বিষয়ে তিনি বলেন, খুলনা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) আরও কার্যকর করতে দুজন সহকারী পুলিশ কমিশনারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ডিবি রাজধানী ঢাকা থেকে চারজন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নগরীর সোনাডাঙ্গা এলাকা থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি রিভলভার ও গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ কমিশনারের দাবি, গত এক মাসে নগরীতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে মাদক কারবারিদের আনাগোনাও কমেছে। সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার ও মাদক নির্মূলে নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডেই বিভিন্ন ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
সুন্দরবনে ৫৯ দস্যুর আত্মসমর্পণ
খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি সুন্দরবনে জলদস্যু ও বনদস্যু দমনে বড় ধরনের সাফল্যের কথা জানিয়েছে র্যাব-৬।
র্যাব-৬-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. নিস্তার আহমেদ জানান, গত ২ মার্চ থেকে র্যাবের নেতৃত্বে র্যাব, কোস্ট গার্ড, পুলিশ, নৌপুলিশ ও বন বিভাগের সমন্বয়ে ‘রি-স্টার্ট পিস ইন সুন্দরবন’ নামে বিশেষ অভিযান শুরু হয়।
এর ধারাবাহিকতায় গত ৩১ আগস্ট পাঁচ বাহিনীর প্রধানসহ ৫৯ জন জলদস্যু ও বনদস্যু র্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
আত্মসমর্পণকারীদের কাছ থেকে ৫৯টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৪১ রাউন্ড তাজা গুলি, ১৪টি খালি কার্তুজ এবং সাতটি ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়।
পরদিন র্যাবের মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ র্যাব-৬ কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, দস্যুদের লুণ্ঠিত অস্ত্র থানা ও ফাঁড়ি থেকে উদ্ধারে র্যাবের নেতৃত্বে দ্রুত যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
আট মাসে গ্রেপ্তার ৬৩৪ সন্ত্রাসী
র্যাব-৬-এর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত আট মাসে ৬৩৪ জন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময়ে ৩৫ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ৪৬টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৯৫ রাউন্ড গুলি, ১৩টি ম্যাগাজিন এবং ৮৪টি বোমা ও ককটেল।
একই সময়ে র্যাবের অভিযানে ১ হাজার ৯৫৬ বোতল ফেনসিডিল, ৪২ হাজার ১৯টি ইয়াবা, ৩২৩ দশমিক ২ কেজি গাঁজা, ২৩৮ দশমিক ৮৪ লিটার দেশি মদ, ১ হাজার ২৩৯ বোতল ফায়াড্রিল, ১ দশমিক ৫১ কেজি ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, ৬ হাজার ৯৯৫ বোতল ইসকাফ সিরাপ, ২২ হাজার ৮২৪টি ট্যাপেন্টাডল, ১৫ হাজার ২৯৮ বোতল উইনকরিক্স এবং ৯৬ হাজার পিস পাতার বিড়ি উদ্ধার করা হয়েছে।
জোড়া হত্যা মামলার প্রধান আসামি দুই দিনের মধ্যে গ্রেপ্তার
র্যাব-৬-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. নিস্তার আহমেদ বলেন, হত্যা, ধর্ষণসহ বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর অপরাধের ঘটনায় র্যাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি জানান, লবণচরার আশিবিঘায় জোড়া হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি সন্ত্রাসী আল আমিন ওরফে সাইফিকে হত্যাকাণ্ডের মাত্র দুই দিনের মধ্যে গোপালগঞ্জ সদর থানার মাঝিরগাতি বাজার এলাকা থেকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তিনি সাধারণ মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন।
অভিযান বাড়লেও কাটছে না আতঙ্ক
পুলিশ ও র্যাবের দাবি, ধারাবাহিক অভিযান, অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার এবং মাদকবিরোধী কার্যক্রমের কারণে খুলনার অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে। তবে নগরীতে মাঝেমধ্যে খুন, গুলিবর্ষণ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনায় সেই দাবির সঙ্গে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধের একটি ফারাক থেকেই যাচ্ছে।
প্রশ্ন উঠছে, এত অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধী গ্রেপ্তারের পরও কেন পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড?
নগরবাসীর প্রত্যাশা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান শুধু অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অপরাধের নেপথ্যে থাকা মদদদাতা, অস্ত্র সরবরাহকারী এবং অর্থের উৎস শনাক্ত করার দিকে আরও জোর দেওয়া হবে। অপরাধের মূল উৎসে আঘাত করা সম্ভব হলে খুলনার দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা-আতঙ্ক অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন তারা।

