বাগেরহাট প্রতিনিধি:
পরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে বৃহত্তর খুলনাকে আধুনিক, দৃষ্টিনন্দন ও পরিবেশবান্ধব জনপদ হিসেবে গড়ে তুলতে জনগণের অংশগ্রহণকে অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) চেয়ারম্যান এডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনা। তিনি বলেছেন, উন্নয়ন কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়; সরকার, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
বাগেরহাট ও মোংলায় কেডিএর সেবা এবং মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে আয়োজিত পৃথক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। বাগেরহাট সদর উপজেলায় সোমবার বিকেলে এবং মোংলায় রাতে সভা দুটি অনুষ্ঠিত হয়। কেডিএর সেবা সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা এবং মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে স্থানীয় মানুষের মতামত গ্রহণের লক্ষ্যে এসব কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
বাগেরহাটের সভায় কেডিএ চেয়ারম্যান বলেন, জনগণের মতামত, পরামর্শ এবং প্রশাসনিক নিয়ম মেনে চলার সংস্কৃতিই একটি পরিকল্পিত শহর গড়ে তোলার প্রধান ভিত্তি। শুধু সরকারি উদ্যোগে টেকসই নগরায়ণ সম্ভব নয়। স্থানীয় বাস্তবতা ও মানুষের প্রয়োজনকে পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করেই উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে।
তিনি বলেন, কেডিএর মাস্টারপ্ল্যানের অন্যতম লক্ষ্য হলো কৃষিজমি সুরক্ষার পাশাপাশি আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্পাঞ্চলের সুশৃঙ্খল বিন্যাস নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে বৃহত্তর খুলনার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো প্রশস্ত করা, প্রয়োজনীয় বাইপাস সড়ক নির্মাণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বাগেরহাটের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর নান্দনিকতা ও পরিবেশগত গুরুত্ব অক্ষুণ্ন রেখে গ্রিন জোন ও পার্ক নির্মাণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ডিজিটাল হচ্ছে কেডিএর সেবা
কেডিএর সেবা পেতে নাগরিকদের হয়রানি ও জটিলতার অভিযোগের কথা স্বীকার করে চেয়ারম্যান শফিকুল আলম মনা বলেন, প্রতিষ্ঠানটিকে নাগরিকবান্ধব ও স্বচ্ছ করতে কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন সেবা ও আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি তা ধীরে ধীরে পুরোপুরি ডিজিটাল করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, নাগরিকদের যেন একটি সেবা নিতে বারবার কেডিএ কার্যালয়ে যেতে না হয়, সে লক্ষ্যেই প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে কেডিএ।
মাস্টারপ্ল্যানে বাগেরহাটকে অন্তর্ভুক্তির দাবি
বাগেরহাটে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা জেলার গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোকে কেডিএর মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় আনার দাবি জানান। বিশেষ করে বাগেরহাট পৌরসভা, ষাটগম্বুজ ইউনিয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর পরিকল্পিত উন্নয়নের ওপর জোর দেন তারা।
অংশীজনরা জেলার ভঙ্গুর যোগাযোগ ব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং সুপেয় পানির সংকটের কথাও তুলে ধরেন। এসব সমস্যা সমাধানে কেডিএকে কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
বাগেরহাট জেলা পরিষদের প্রশাসক ব্যারিস্টার শেখ মো. জাকির হোসেন বলেন, জেলার যোগাযোগ ও পৌর অবকাঠামো দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটে রয়েছে। মশার উপদ্রব ও নিরাপদ পানির সংকটও অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। এমন বাস্তবতায় কেডিএর পরিকল্পিত উন্নয়ন উদ্যোগকে তিনি বাগেরহাটবাসীর জন্য নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন, পরিকল্পিত উন্নয়ন বাস্তবায়নে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; সাধারণ মানুষসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
পানি ও আবাসন নিয়ে কেডিএর আশ্বাস
বাগেরহাটবাসীর চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজন হলে প্রশস্ত সড়ক, পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা এবং সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় পানি শোধনাগার বা প্লান্ট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান কেডিএ চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার অবহেলিত খুলনা অঞ্চলকে উন্নয়নের একটি মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। পরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে এই অঞ্চলের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্যেই কেডিএকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
কেডিএর আওতাধীন উন্নয়ন কার্যক্রম খুলনা ও যশোরের পাশাপাশি বাগেরহাটের ফকিরহাট, সদর, রামপাল ও মোংলা উপজেলার আংশিক এলাকাতেও বিস্তৃত রয়েছে বলে জানান তিনি।
সভায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ
বাগেরহাট জেলা পরিষদের প্রশাসক ব্যারিস্টার শেখ মো. জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য দেন বাগেরহাটের পুলিশ সুপার হাছান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মেজবা উদ্দিন, বাগেরহাট জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মোজাফফর রহমান আলম, বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি শেখ শাহেদ আলী রবি, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ নাসির আহম্মেদ মালেক ও কচুয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরদার জাহিদসহ অনেকে।
প্রায় দুই ঘণ্টার সভায় বাগেরহাট সদর উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজন অংশ নেন। কেডিএর পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সেবা ও প্রস্তাবিত মাস্টারপ্ল্যানের বিভিন্ন দিক সচিত্র উপস্থাপনার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।
স্থানীয় জনগণের পক্ষে মতামত দেন জেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. সুজন মোল্লা, জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক সৈয়দ আশরাফউদ্দৌলা জুয়েল, সদর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান শিমুল, সাংবাদিক ইয়ামিন আলী, এস এস সোহানসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা।
মোংলাতেও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে মতবিনিময়
বাগেরহাটের কর্মসূচির পর রাতে মোংলা উপজেলায়ও কেডিএর সেবা ও মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। মোংলা উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র আলহাজ জুলফিকার আলীর সভাপতিত্বে সভায় কেডিএর সেবা বিষয়ে বক্তব্য দেন প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) কাজী মো. সাবিরুল আলম।
মাস্টারপ্ল্যানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন কেডিএর পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. তানভীর আহমেদ। দুই কর্মসূচিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মী এবং বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ অংশ নেন।
মতবিনিময় সভাগুলোতে উঠে আসা মতামত ও দাবিগুলোকে কেডিএর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেওয়া হবে এমন প্রত্যাশাই তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা কাটিয়ে বাগেরহাট-মোংলাকে পরিকল্পিত উন্নয়নের ধারায় আনতে হলে এখন প্রয়োজন বাস্তবসম্মত মাস্টারপ্ল্যান এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন।

