মধুমতি অনলাইন ডেস্ক:
সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচির প্রথম দিন দেশজুড়ে ব্যাপক সংঘর্ষ, প্রাণহানি এবং অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে অন্তত ৩৩টি জেলা ও মহানগরে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, সড়ক অবরোধ এবং সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া যায়। বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে।
রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় ৪ আগস্ট ২০২৪ দুপুরের পর থেকে হাজারো মানুষ জড়ো হতে থাকেন। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে শিক্ষার্থী, তরুণ, পেশাজীবী, নারী-পুরুষসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। শহীদ মিনারের বেদি থেকে দোয়েল চত্বর, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকা, পলাশী মোড় ও আশপাশের সড়কগুলো আন্দোলনকারীরা অবস্থান নেয়। সরকারবিরোধী নানা স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন জেলাতেও একই সময়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। গাজীপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, রাজশাহী, টাঙ্গাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, রংপুর, মুন্সিগঞ্জ, মাগুরাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কুমিল্লায় শিক্ষার্থীদের মিছিলে হামলার ঘটনায় কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। বিভিন্ন জেলায় শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, টিয়ারগ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড, শটগানের গুলি এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় বহু এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদেরও সংঘর্ষে জড়াতে দেখা যায়।
দিনব্যাপী সংঘর্ষে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়। পাশাপাশি সিরাজগঞ্জে সংঘর্ষের মধ্যে ১৩ জন পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার খবর আলোচনায় আসে। আহতের সংখ্যা কয়েক শতাধিক বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়।
চট্টগ্রাম শহরে শিক্ষামন্ত্রীর বাসভবনে হামলা এবং একটি সংসদ সদস্যের কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনায় রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।
অসহযোগ কর্মসূচির অংশ হিসেবে আন্দোলনকারীরা দেশের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মহাসড়ক অবরোধ করেন। যাত্রাবাড়ী, চন্দ্রা, মাওনা, বঙ্গবন্ধু সেতু এলাকা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-লক্ষ্মীপুর মহাসড়কসহ বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র যানজট ও ভোগান্তির সৃষ্টি হয়।
পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে সরকার মোবাইল ফোর-জি ইন্টারনেট সেবা বন্ধের নির্দেশ দেয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রামের কার্যক্রমও সীমিত করা হয়। সন্ধ্যা থেকে সারাদেশে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়, যা বিভাগীয় সদর, জেলা, উপজেলা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও শিল্পাঞ্চলে কার্যকর করা হয়।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ৫, ৬ ও ৭ আগস্ট সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক গুরুত্ব পায়। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, বিবিসি, আল-জাজিরা, রয়টার্স, এএফপি, এপি, এনডিটিভি ও হিন্দুস্তান টাইমসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আন্দোলন, সংঘর্ষ, প্রাণহানি এবং সরকারি পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
উল্লেখ্য, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরবর্তী সময়ে সরকারবিরোধী এক দফা দাবির আন্দোলনে রূপ নেয়।
চব্বিশের জুলাই মাসজুড়ে সংঘর্ষ, সহিংসতা ও প্রাণহানির ধারাবাহিকতায় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং অসহযোগ কর্মসূচির প্রথম দিন সেই সংকট নতুন মাত্রা লাভ করে।

