মধুমতি অনলাইন ডেস্ক:
সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে দেশজুড়ে নতুন মাত্রা পায় শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের আন্দোলন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে শুক্রবার রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ৩৩টি জেলা ও মহানগরে বিক্ষোভ, গণমিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
অধিকাংশ স্থানে কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি এলাকায় সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় নতুন করে প্রাণহানির পাশাপাশি শতাধিক মানুষ আহত হন।
রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। একই সময়ে ঢাকার উত্তরা, সিলেট, খুলনা, লক্ষ্মীপুর, নরসিংদী ও হবিগঞ্জসহ কয়েকটি এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, কয়েকটি স্থানে ধারালো অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগও ওঠে।
হবিগঞ্জে সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে এক শ্রমিক নিহত হন। খুলনায় হামলার ঘটনায় দায়িত্ব পালনরত পুলিশের এক সদস্য প্রাণ হারান। বিভিন্ন জেলার সংঘর্ষে অন্তত ৩৭০ জন আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে ১৬ থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত সহিংসতায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুসহ মোট ২১৩ জন নিহত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। শুক্রবারের নতুন দুই মৃত্যুর পর প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২১৫ জন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পূর্বঘোষিত ‘প্রার্থনা ও ছাত্র-জনতার গণমিছিল’ কর্মসূচি জুমার নামাজের পর শুরু হয়। দেশের অন্তত ২৮টি জেলায় কর্মসূচি পালিত হয়। এর মধ্যে ২২টি স্থানে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি সম্পন্ন হলেও কয়েকটি এলাকায় সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তোলে। বৃষ্টি উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবক, শিক্ষক এবং বিভিন্ন পেশার মানুষও মিছিলে অংশ নেন।
সমাবেশগুলোতে শিক্ষার্থীরা নিহতদের বিচার, গ্রেপ্তার আন্দোলনকারীদের মুক্তি, হয়রানি বন্ধ এবং পূর্বঘোষিত ৯ দফা দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায়।
উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরে বিকেলে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের বাকবিতণ্ডা থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এর আগে সকাল থেকেই রাজউক উত্তরা মডেল কলেজসংলগ্ন এলাকায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করছিলেন।
এদিকে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। গণভবনে পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, গণভবনের দরজা আন্দোলনকারীদের জন্য খোলা এবং প্রয়োজন হলে তারা অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়েও আলোচনায় অংশ নিতে পারেন। তিনি সংঘাত নয়, আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অন্যদিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনা সদরের হেলমেট অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘অফিসার্স অ্যাড্রেস’-এ দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি সেনা কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জনগণের আস্থার প্রতীক এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সব সময় জনগণের পাশে থাকবে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও আন্দোলন নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দাবি করেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ একটি গণজাগরণের রূপ নিয়েছে। তাঁর ভাষ্য, আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হবে বলে তিনি আশাবাদী।
দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ঘিরে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহল পরিস্থিতি শান্ত রাখতে সংলাপ, সংযম এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করছে।

