রাজনীতি ডেস্ক:
‘বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বন্ধু’ দাবি করেও প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের ‘বড় কিলারকে’ আশ্রয় দিয়ে কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করেছে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “কাজ করবেন শত্রুর, অথচ গালভরা বলবেন আমি বন্ধু। বাংলাদেশের মানুষ এত বোকা নয়।”
রোববার বিকেলে রাজধানীর ইস্কাটনের শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান—ন্যায়বিচার, মেধার মূল্যায়ন ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক ৩৬ জুলাই উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘বড় বন্ধু হলে আশ্রয় দিলেন কেন?’
প্রতিবেশী দেশের ভূমিকার সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, তারা নিজেদের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বন্ধু হিসেবে দাবি করে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে বন্ধু হলে বাংলাদেশের মানুষের কাছে ‘বড় কিলার’ হিসেবে পরিচিত একজনকে কেন আশ্রয় দেওয়া হয়েছে—সেই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে।
তার অভিযোগ, শুধু আশ্রয় দেওয়াই নয়, দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারকে উপেক্ষা করে তাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানান তিনি।
‘পালিয়ে যাওয়ার পরও উঁকি-ঝুঁকি’
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, একটি সমাজে অপরাধীরা যখন ভয়াবহ পরিণতির আশঙ্কা করে, তখন তারা পালিয়ে যায়। বর্তমানে যারা পালিয়ে আছেন, তারা মাঝেমধ্যে উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে নিজেদের ফিরে আসার বার্তা দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, যে ব্যক্তি প্রতিদিন বলে আত্মহত্যা করবে, সাধারণত সে আত্মহত্যা করে না। একইভাবে প্রকৃত বীর নিজেকে বীর বলে প্রচার করেন না; তার কর্মকাণ্ডই তাকে বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
শফিকুর রহমান প্রশ্ন করেন, “এত সাহস থাকলে গেলেন কেন?”
‘জাতির সঙ্গে এই তামাশা আর দেখতে চায় না মানুষ’
শেখ হাসিনার বিদেশে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে শফিকুর রহমান বলেন, একসময় বলা হয়েছিল তিনি মক্কা যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাকে মস্কো নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখন আবার গোপালগঞ্জে যেতে চেয়েছিলেন এমন বক্তব্য সামনে আসছে।
তিনি দাবি করেন, দেশ ছাড়ার আগে-পরে পাশের দেশে একাধিক ফোন করা হয়েছিল এবং সেখানে আশ্রয় চাওয়া হয়েছিল। প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, তাহলে কি গোপালগঞ্জে যাওয়ার জন্যই ভারতের কাছে ফোন করা হয়েছিল?
“জাতির সঙ্গে এই তামাশা তারা আর দেখতেও চায় না, শুনতেও চায় না” বলেন জামায়াত আমির।
‘ফ্যাসিবাদ কোনো ব্যক্তি নয়, এটি একটি ভাইরাস’
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটেছে। কিন্তু নতুন করে কোনো ফ্যাসিবাদ দেখতে চান না তারা।
তার ভাষায়, ফ্যাসিবাদ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি নয়; এটি একটি ভাইরাস। এই ভাইরাস যাকে পাবে, তাকেই ফ্যাসিবাদীতে পরিণত করবে।
তিনি বলেন, যে কর্মকাণ্ডের কারণে একটি সরকারকে ফ্যাসিবাদী বলা হয়েছে, পরবর্তীতে একই ধরনের কর্মকাণ্ড কেউ করলে তাকেও একইভাবে ফ্যাসিবাদী বলতে হবে।
“অন্যের সন্তান একই কাজ করলে তাকে সন্ত্রাসী বলব, আর আমার সন্তান করলে তাকে সন্ত্রাসী বলব না এটা হতে পারে না,” বলেন তিনি।
‘মেধাতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কোথায়?’
বর্তমান সরকারের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশে আসার আগে ও পরে একাধিকবার মেধাতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কোথায় তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তার অভিযোগ, সৎ, মেধাবী, দেশপ্রেমিক ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের স্বৈরাচারী আমলের মতোই বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। তাদের বিভিন্ন স্থানে পোস্টিং দিয়ে নাজেহাল করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তিদের দিয়ে রাষ্ট্রীয় সেবা নিশ্চিত না করে যদি তাদের প্রতি প্রতিশোধ নেওয়া হয়, তাহলে সেই প্রতিশোধ কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয় পুরো জাতির বিরুদ্ধে।
‘মজলুমরা আবার জালিম হচ্ছে কেন?’
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে জামায়াত আমির বলেন, অতীতে যারা সরকারি ও বিরোধী দলে ছিলেন, তাদের অনেকেই কোনো না কোনোভাবে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—মজলুমরাই আবার কেন জালিমের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন?
তিনি সতর্ক করে বলেন, একজন মজলুম যখন জালিম হয়ে ওঠে, তখন তার পরিণতি আগের জালিমের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে।
ক্ষমতার দম্ভে কাউকে দিশাহারা না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যেকোনো সময় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। যারা একসময় ক্ষমতায় ছিল, তাদের কেউ আজ সংসদে নেই তাদের কর্মকাণ্ডের কারণেই তারা জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছে’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য ছিল সব ধরনের বৈষম্য ও বিভেদ দূর করে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন করা এমন মন্তব্য করে শফিকুর রহমান বলেন, এ আন্দোলনে শুধু তরুণ শিক্ষার্থীরাই নয়, সাধারণ মানুষ, শ্রমিক এবং আলেম-ওলামারাও অংশ নিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী আন্দোলনে ১৪ শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে প্রায় ৬ থেকে ৭ শতাধিক ছিলেন সাধারণ শ্রমিক।
তার মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান একটি নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা তৈরি করেছে। সেই প্রত্যাশা পূরণে শহীদদের মর্যাদা রক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন অপরিহার্য।
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মাননা
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে এনডিএফ সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম জুলাই আন্দোলনে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের সাহসিকতার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে ন্যায়ভিত্তিক, মেধানির্ভর ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনে এনডিএফ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি।
অনুষ্ঠানে চিকিৎসক, শিক্ষার্থী, শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্য, গবেষক, গণমাধ্যমকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
এ সময় চিকিৎসা, নার্সিং, মেডিকেল টেকনোলজি, স্বাস্থ্য সাংবাদিকতা, রক্তসেবা, মানবিক সহায়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে মোট ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা দেওয়া হয়।

