স্পোর্টস ডেস্ক:
২০১২ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে নানা বিতর্ক, অনিয়ম ও আয়োজনগত সীমাবদ্ধতা থাকলেও বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) প্রায় প্রতিবছরই মাঠে গড়িয়েছে। তবে এবার সেই ধারায় বড় ছেদ পড়তে যাচ্ছে। চলতি বছর বিপিএল আয়োজন না করার ইঙ্গিত দিয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি তামিম ইকবাল।
মিরপুরে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৯ ও অনূর্ধ্ব-২৩ দলকে নিয়ে গেম ডেভেলপমেন্ট ট্রফি আয়োজনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে এসে বিপিএলের ভবিষ্যৎ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন সাবেক এই অধিনায়ক।
বিপিএল এবার হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তামিমের সংক্ষিপ্ত উত্তর, ‘আই ডোন্ট থিংক সো। এ বছর বিপিএল হবে না।’
তবে এটিকে বিপিএলের সমাপ্তি হিসেবে দেখছেন না বিসিবি সভাপতি। বরং সময় নিয়ে, নতুন কাঠামোয় এবং আর্থিকভাবে টেকসই একটি টুর্নামেন্ট হিসেবে বিপিএলকে সাজানোর পরিকল্পনার কথাই জানিয়েছেন তিনি।
বিপিএলের জায়গায় আসছে নতুন কিছু?
বিপিএলের সময়টিকে পুরোপুরি ফাঁকা রাখতে চায় না বিসিবি। দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের ক্যালেন্ডার নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা চলছে বলে জানিয়েছেন তামিম।
তিনি বলেন, আমরা একটা ফর্মুলা নিয়ে কাজ করছি। যখন ৬০-৭০ শতাংশ কাজ হয়ে যাবে, তখন আমি ঘোষণা দেব আমাদের ঘরোয়া ক্যালেন্ডারটা আমরা কীভাবে সাজাচ্ছি। এটা বেশ আলাদা ও রোমাঞ্চকর হবে।
অর্থাৎ, বিপিএল না হলেও ক্রিকেটার ও দর্শকদের জন্য বিকল্প কোনো প্রতিযোগিতা বা নতুন ধরনের ক্রিকেট আয়োজন নিয়ে কাজ করছে বোর্ড। তবে পরিকল্পনা পুরোপুরি চূড়ান্ত হওয়ার আগে বিস্তারিত জানাতে রাজি নন বিসিবি সভাপতি।
দুই বছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকার লোকসান
বিপিএল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি।
তামিমের ভাষ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে বিপিএল আয়োজন করতে গিয়ে বিসিবির প্রায় ৪০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ালে কিংবা চুক্তির শর্ত বা কমপ্লায়েন্স পূরণ করতে ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত সেই দলের দায়িত্বও বিসিবিকেই নিতে হয়।
তামিম বলেন, সমস্যা হলো, যদি কোনো দল টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ায় বা কমপ্লায়েন্স পূরণ না করে, তবে বিসিবিকে সেই দলের দায়িত্ব নিতে হয়। গত দুই বছরে বিসিবির প্রায় ৪০ কোটি টাকার মতো লোকসান হয়েছে।
তার মতে, একটি সফল ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ থেকে ক্রিকেট বোর্ডের আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে যদি উল্টো লোকসানের বোঝা বাড়তে থাকে, তাহলে শুধু ধারাবাহিকতা ধরে রাখার জন্য টুর্নামেন্ট আয়োজনের কোনো যৌক্তিকতা নেই।
‘ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট থেকে তো বিসিবির লাভ করার কথা, লোকসান নয়। তাই সমস্যাগুলোর সমাধান না করা পর্যন্ত লোকসান গুনে টুর্নামেন্ট চালিয়ে যাওয়া আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়,’ বলেন তিনি।
বিপিএল নিয়ে হতাশার খবরের মধ্যেও আশার কথাও শুনিয়েছেন তামিম। তার দাবি, বিসিবি বিপিএল বন্ধ করে দিতে চায় না। বরং এমনভাবে ফিরিয়ে আনতে চায়, যাতে টুর্নামেন্টটি সত্যিকার অর্থেই দেশের ক্রিকেটের অন্যতম বড় ব্র্যান্ড হয়ে উঠতে পারে।
তামিম বলেন,
‘আমাদের ইনটেনশন ১০০০ শতাংশ আছে বিপিএল করার। কিন্তু আমি তাড়াহুড়া করতে চাই না। ঠিকঠাক মতো করতে চাই। তাতে যদি ৬ মাস বা ১২ মাস সময় লাগে, আমি নেব।’
এই বক্তব্যে স্পষ্ট, বিসিবি আপাতত বিপিএলকে ‘বিরতি’ দিয়ে এর কাঠামো, ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থাপনা, আর্থিক নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক আয়োজন নতুনভাবে সাজানোর সময় নিতে চায়।
ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ক্রিকেটাররাও
বিপিএল না হলে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে দেশের ক্রিকেটারদের ওপর। বিশেষ করে জাতীয় দলের বাইরে থাকা অনেক ক্রিকেটারের জন্য বিপিএল ছিল বছরে বড় অঙ্কের আয়ের অন্যতম সুযোগ।
এ বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিসিবি সভাপতি নিজেও। তামিম বলেন, আমি খেলোয়াড় থাকলে নিজেও হতাশ হতাম। তাদের আর্থিক ক্ষতি হবে, এটা আমি অস্বীকার করি না। তবে খেলোয়াড়দের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তার মতে, ক্রিকেটাররাও চান একটি মানসম্মত ও সুশৃঙ্খল বিপিএল।
‘তাদেরও বোঝা উচিত যে এই টুর্নামেন্টটা এমন হওয়া উচিত, যা নিয়ে বিসিবি গর্ব করতে পারে। গত কয়েক বছরে যা হয়েছে, তা নিয়ে কি আমরা গর্বিত? হয়তো না।’
এবার কি সত্যিই বদলাবে বিপিএল?
বিপিএল বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টগুলোর একটি হলেও আন্তর্জাতিক মানের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ হিসেবে এর কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন দীর্ঘদিনের। ফ্র্যাঞ্চাইজির আর্থিক অনিশ্চয়তা, দল বদল, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং টুর্নামেন্টের ধারাবাহিক ব্র্যান্ডিং নিয়ে সমালোচনা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।
তামিমের বক্তব্যে এবার একটি বিষয় পরিষ্কার শুধু সময়মতো টুর্নামেন্ট আয়োজন করাই আর বিসিবির লক্ষ্য নয়; তারা এমন একটি বিপিএল চায়, যেটি আর্থিকভাবে লাভজনক, ব্যবস্থাপনাগতভাবে স্থিতিশীল এবং আন্তর্জাতিকভাবে আরও আকর্ষণীয় হবে।
বিসিবি সভাপতির ভাষায়, বিপিএল একটি ‘গ্রেট প্রোডাক্ট’ এবং এটিকে ঘিরে মানুষের আগ্রহও অনেক। এখন প্রয়োজন সেই আগ্রহকে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে আরও বড় জায়গায় নিয়ে যাওয়া।
তাই এবার হয়তো মাঠে গড়াবে না বিপিএল। কিন্তু বিসিবির পরিকল্পনা সফল হলে, এই বিরতিই হতে পারে দেশের সবচেয়ে বড় ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের নতুন করে শুরু করার সময়।

