রংপুর প্রতিনিধি:
একটি বাড়ি। একই পরিবারের চার সদস্য। একের পর এক হত্যাকাণ্ড। আর সেই হত্যার পর ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে অভিযুক্তরা নাকি আরও প্রায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা অবস্থান করেন সেই বাড়িতেই।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সময় তারা গোসল করেছেন, ডাইনিং টেবিলে রাখা খেজুর খেয়েছেন, ফ্রিজ থেকে বের করে শসা খেয়েছেন এবং পরে বাড়ির স্বর্ণালংকার নিয়ে বেরিয়ে যান।
রংপুর নগরীর দাসপাড়া-মাছুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক গণপতি চক্রবর্তী এবং তার পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যার ঘটনায় পুলিশ দুইজনকে আটক করার পর বেরিয়ে এসেছে এমনই কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য।
আটক দুজন হলেন মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস। তারা পরস্পরের আত্মীয় এবং একই এলাকার বাসিন্দা বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাদের মধ্যে একজন স্থানীয় একটি স্বর্ণের দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করেন।
ছাদে ওঠা, মাদক সেবন, তারপর শুরু হত্যাকাণ্ড
রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী পাশের একটি নির্মাণাধীন বাড়ি ব্যবহার করে দুই ব্যক্তি গণপতি চক্রবর্তীদের বাড়ির ছাদে ওঠেন।
পুলিশের দাবি, ছাদে ওঠার পর তারা ইয়াবা সেবন করেন।
একপর্যায়ে ছাদে শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী সেখানে গেলে তাদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়। এরপরই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয় বলে পুলিশের ভাষ্য।
পুলিশ কমিশনার জানান, গণপতি চক্রবর্তীর গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। এ সময় তিনি নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করলে শব্দ হয়।
সেই শব্দ শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করেন। পুলিশের দাবি, তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়।
এরপর প্রীতিলতার চিৎকার শুনে এগিয়ে আসেন তাদের মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী। তাকেও রশি দিয়ে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সবশেষে পরিবারের ১২ বছর বয়সী ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীকে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে এবং বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের ভাষ্য।
চারজনকে হত্যার পরও বাড়িতেই ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা
তদন্তের সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্যগুলোর একটি হলো চার সদস্যকে হত্যার পরও অভিযুক্তরা তৎক্ষণাৎ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাননি।
রংপুর ডিবির ডিসি সনাতন চক্রবর্তী বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে আটক দুজন ঘটনার পর আরও প্রায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা ওই বাড়িতে অবস্থান করার কথা স্বীকার করেছেন।
তিনি জানান, দুজনকে একসঙ্গে এবং পৃথকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। উভয়ের বক্তব্যের মধ্যে মিল পাওয়া গেছে বলে দাবি পুলিশের।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর দুই ব্যক্তি বাড়ির বাথরুমে গিয়ে গোসল করেন। এরপর ডাইনিং টেবিলে রাখা খেজুর খান। পরে ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খান।
ঘটনাস্থল থেকে মাদক সেবনের আলামতও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কেন এলোমেলো করা হয়েছিল ঘর?
হত্যার পর বাড়ির বিভিন্ন জিনিসপত্র ইচ্ছাকৃতভাবে এলোমেলো করে রাখা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তকারীদের ধারণা, ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা কিংবা লুটপাটের দৃশ্য তৈরি করতেই এমনটি করা হয়ে থাকতে পারে।
পুলিশ জানিয়েছে, বাড়ির দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিভর্তি বালতিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল।
এ ছাড়া বাড়ি থেকে নেওয়া কিছু স্বর্ণালংকার পরে একটি মন্দিরের পেছনের পরিত্যক্ত স্থানে লুকিয়ে রাখা হয় বলে পুলিশের দাবি। আটক দুজনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সেখান থেকে স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়েছে।
আগুনে পরীক্ষা করা চুড়ির আলামত
তদন্তে পাওয়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত ছিল আগুনে পরীক্ষা করা চুড়ির চিহ্ন।
পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, এসব আলামত বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীদের সন্দেহ হয়—স্বর্ণের বিষয়ে অভিজ্ঞ কেউ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।
পরবর্তীতে বিভিন্ন আলামত, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে শনাক্ত ও আটক করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর জানা যায় চারজনের মৃত্যুর খবর
শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে রংপুর নগরীর দাসপাড়া-মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি দোতলা বাড়ি থেকে চারজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহতরা হলেন—অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী এবং ১২ বছর বয়সী ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী।
পুলিশ জানিয়েছে, লাশগুলোতে পচন ধরেছিল এবং পুরো বাড়িতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বৃহস্পতিবার প্রীতিলতা চক্রবর্তীর সর্বশেষ কথা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তার বোন পূজা চক্রবর্তী। এরপর থেকে শনিবার পর্যন্ত তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
পরে স্বজনেরা বাড়িতে এসে মূল দরজা বন্ধ দেখতে পান। সন্দেহ হওয়ায় তারা পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজা ভেঙে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে একে একে চারজনের লাশ উদ্ধার করে।
‘কারও সঙ্গে কোনো শত্রুতা ছিল না’
গণপতি চক্রবর্তীর ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছেন।
তিনি বলেন, তার ভাই খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন এবং কারও সঙ্গে তার কোনো শত্রুতা ছিল না।
কেন একই পরিবারের চারজনকে এমন নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো, সেই প্রশ্নের উত্তর সঠিক তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
খবর পেয়ে তিনি মিঠাপুকুরের গ্রামের বাড়ি থেকে রংপুরে ছুটে আসেন বলেও জানান।
তদন্তে এখন মূল প্রশ্ন হত্যার পেছনে কি শুধু লুটপাট?
পুলিশ বলছে, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া মাদক সেবনের আলামত, খেজুরের বিচি, শসা খাওয়ার চিহ্ন, স্বর্ণালংকার এবং অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করেই সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
তবে তদন্তের সামনে এখনো বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কি কেবল স্বর্ণালংকার লুটের উদ্দেশ্য ছিল, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো কারণ?
পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, গণপতি চক্রবর্তী একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন এবং কারও সঙ্গে তার কোনো বিরোধের তথ্য পাওয়া যায়নি। তারপরও একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার মতো ভয়াবহ ঘটনা কীভাবে ঘটল, তা তদন্ত করে বের করার চেষ্টা চলছে।
চারটি প্রাণহানির এই ঘটনায় আটক দুজনের জিজ্ঞাসাবাদ, উদ্ধার হওয়া আলামত এবং ফরেনসিক তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ চিত্র সামনে আসবে বলে আশা করছে পুলিশ।

