নিজস্ব প্রতিবেদক:
ফেনীর আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি শেষে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং বাকি ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
রায়কে কেন্দ্র করে নুসরাতের পরিবারের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সোনাগাজী পৌরসভার উত্তর চরচন্দিয়া এলাকায় নুসরাতদের বাড়িতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সোনাগাজী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসিম বলেন, রায়কে কেন্দ্র করে নুসরাতের পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তায় পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বলেন, একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে আজও তিনি শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। নিম্ন আদালতের রায়ে তারা ন্যায়বিচার পেয়েছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে তারা এখনো শঙ্কার মধ্যে রয়েছেন।
তিনি বলেন, “একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে আজও পাগলের মতো আছি। নিম্ন আদালতে আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি। তবে এখনো তিন ছেলেকে নিয়ে নিরাপত্তা শঙ্কার মধ্যে রয়েছি। পুলিশ আমাদের সার্বিক নিরাপত্তা দিচ্ছে। সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে সহযোগিতা এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।”
যেভাবে হাইকোর্টে আসে মামলাটি
২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার সব নথি, যা ডেথ রেফারেন্স নামে পরিচিত, হাইকোর্টে পৌঁছায়। এরপর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলার পেপারবুক প্রস্তুতের কাজ সম্পন্ন করা হয়।
প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে শুনানির জন্য মামলাটি প্রধান বিচারপতির কাছে উপস্থাপন করা হলে তিনি সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট বেঞ্চ নির্ধারণ করে দেন।
ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, কোনো বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলে সেই সাজা কার্যকর হওয়ার আগে উচ্চ আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এ কারণে মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরাও জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল করেন।
এর আগে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ মামলাটির রায় ঘোষণা করেন। ওই রায়ে অভিযুক্ত ১৬ আসামির প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়।
যেভাবে হত্যা করা হয় নুসরাতকে
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন নুসরাতের মা শিরিন আক্তার। অভিযোগের পর পুলিশ সিরাজ-উদ-দৌলাকে গ্রেপ্তার করে।
এরপর তাকে কারাগার থেকে বের করে আনার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নুসরাতকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয় বলে মামলার তদন্তে উঠে আসে। ৩ এপ্রিল কারাগারে সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে পরামর্শের পর ৪ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে নুসরাতকে কৌশলে একটি সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়ে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়।
গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় নুসরাতকে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল মারা যান নুসরাত।
মাত্র ৬১ কার্যদিবসে বিচারিক কার্যক্রম
এ ঘটনায় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে ৮ এপ্রিল মামলা করেন। পরে ২৮ মে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ২০ জুন অভিযোগ গঠনের পর শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ।
মামলাটিতে মাত্র ৬১ কার্যদিবসে ৮৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হয়। এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত রায়ের জন্য ২৪ অক্টোবর দিন নির্ধারণ করেন।
হাইকোর্টের সর্বশেষ রায়ে নিম্ন আদালতের দেওয়া ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের সাজায় বড় পরিবর্তন এসেছে। দুইজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকার পাশাপাশি চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং ১০ জনকে খালাস দিয়েছেন আদালত।
এই রায়কে নুসরাত হত্যা মামলার দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

