বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ যোগাযোগ আমাদের পরিচয়
English
সর্বশেষ খুলনা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার আজকের নামাজের সময়সূচি ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ● নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এমপি হেলাল দিঘলিয়ার সারোয়ার খান কলেজ সরকারিকরণের উদ্যোগ ● বৃষ্টির শঙ্কায় বাংলাদেশ-চীন ম্যাচ, পরিত্যক্ত হলে সেমিফাইনালে বাংলাদেশ ● নতুন কুঁড়ির ৩০৬ প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদকে বিকেএসপিতে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ সরকারের ● ভূমি অফিসে হাজিরা নিশ্চিত করতে চালু হচ্ছে ‘ভূমিদৃষ্টি’ অ্যাপ
জাতীয়

তারেক রহমানকে দিল্লিতে নিতে কেন আগ্রহ প্রকাশ করছে ভারত

ন্যাশনাল ডেস্ক:

প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে সাধারণত কূটনৈতিক পর্যায়ের নানা বার্তা ও বৈঠক থেকে আভাস পাওয়া যায়। তবে এবার ভারতের রাষ্ট্রপতির দফতর থেকে পাঠানো একটি ই-মেইল বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সম্ভাব্য নতুন সমীকরণ নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

চলতি মাসের শুরুতে পাঠানো ওই বার্তায় জানানো হয়, রাষ্ট্রপতি ভবনে অনুষ্ঠিতব্য ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। বাংলাদেশ সফররত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ওই মহড়া চলছিল বলে বার্তায় উল্লেখ করা হয়।

তবে তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে তখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না থাকায় ই-মেইলটি দ্রুত কূটনৈতিক ও সাংবাদিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বার্তাটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হলেও সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে জল্পনা আরও জোরালো হয়।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এএএম সালেহ জানিয়েছেন, ভারত সফরের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে দিল্লি আগ্রহী বলে বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রের বক্তব্যে উঠে এসেছে। ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির বড় ধরনের বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া তারেক রহমানের এটি হবে প্রথম ভারত সফর।

২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান এবং বর্তমানে সেখানেই অবস্থান করছেন।

এরপর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়ে। এখন নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরায় স্বাভাবিক ও কার্যকর পর্যায়ে নিতে চাইছে ভারত।

তবে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের সময় বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে তার অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শেখ হাসিনা অবশ্য তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এএএম সালেহ বলেন, ‘আমরা অনুকূল পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছি এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার বিষয়ে ভারতের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় আছি।’

ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণসংক্রান্ত অনুরোধটি বিবেচনাধীন রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগও অব্যাহত রেখেছে দিল্লি।

দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে তাকে ‘সর্বোচ্চ সম্মান’ ও ‘স্মরণীয় অভ্যর্থনা’ দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন ভারতের হাইকমিশনার।

সাবেক ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণ মনে করেন, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ ইস্যুতে অগ্রগতি না হলেও বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভারত বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।

তার মতে, বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন বিবেচনায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, চিকিৎসার জন্য ভিসা প্রদান এবং বাণিজ্য সহজ করতে কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থাও পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে।

দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বও বহুমাত্রিক। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ভাষা ও সংস্কৃতিগত ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে সড়ক, রেল ও বন্দর যোগাযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হয়েছিল।

নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ভারতের দাবি করা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ অতীতে ব্যবস্থা নিয়েছে।

তবে শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের বিষয় ছিল। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগের বিষয়গুলো উপেক্ষা করে দিল্লি তৎকালীন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে শেখ হাসিনার দিল্লি থেকে ভার্চুয়াল বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হয়। গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে সাউথ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন তিনি।

সেখানে তিনি বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানান এবং তারেক রহমানের সরকারের বিরুদ্ধে তার সমর্থকদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ তোলেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের মাটিতে তাকে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরে জানায়, ওই অনুষ্ঠানে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং সেখানে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন মনে করেন, শেখ হাসিনার ওই বক্তব্যের সময়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তার আগে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আলোচনা চলছিল।

তার মতে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের মধ্যে তারেক রহমানের দিল্লি সফর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি সংবেদনশীল বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সমীকরণের পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গেও যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সামরিক সফর এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা দিল্লি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে মনে করা হচ্ছে।

এদিকে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি ঘোষিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়েও বাংলাদেশের আগ্রহের কথা উঠে এসেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি হলে তাতে অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা বাংলাদেশের জন্য অস্বাভাবিক নয়।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, নতুন কোনো প্রতিরক্ষা বা কৌশলগত জোটে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সতর্কতার সঙ্গে এগোনো উচিত।

অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

বিশ্লেষকদের মতে, সামগ্রিক পরিস্থিতি ভারতকে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কেও পরিবর্তন এসেছে। শেখ হাসিনার আমলে যে ধরনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, নতুন সরকারের সময়ে সেই একই ধরনের সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে এমন নিশ্চয়তা নেই।

একইভাবে তারেক রহমানের সরকারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি তুলে ধরা, যেখানে বাংলাদেশের সম্পর্ক কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল নয়।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগে অথবা ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনকে কেন্দ্র করে তারেক রহমান ও ভারতের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে বৈঠকের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।

কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা আমন্ত্রণ, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে প্রকাশ্যে চলে আসা একটি ই-মেইলের পর এখন নজর তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের দিকে।

তার ভারত সফর হলে তা শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত কূটনৈতিক সমীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে।

সুত্র: বিবিসি বাংলা

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

একটি মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Notice: ob_end_flush(): Failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/modhumot/public_html/wp-includes/functions.php on line 5493