আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরান যুদ্ধের প্রভাব ক্রমেই গভীর হচ্ছে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি খাতে। সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌ চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। এতে বড় মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো তুলনামূলক কম পরিমাণে তেল বিক্রি করেও উচ্চমূল্যের কারণে স্বল্পমেয়াদে বাড়তি মুনাফা করছে। তবে একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস অবকাঠামোয় হামলা এবং উৎপাদন ও সরবরাহে বিঘ্ন তাদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে সরবরাহ সংকট
যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সংঘাতের আগে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম যেখানে প্রায় ৭২ ডলার ছিল, তা বেড়ে প্রায় ৮৮ ডলারে পৌঁছেছে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ পরিবহনের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি সামরিক উত্তেজনার কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ইরান ও ওমানের মধ্যে সাময়িক চলাচল নিয়ে কিছু সমঝোতা হলেও প্রণালিটি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো বার্তা নেই।
ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির শর্ত পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার নিশ্চয়তা নেই। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে এবং তেলের দামও উচ্চপর্যায়ে অবস্থান করছে।
তেলের দাম বাড়ায় উৎপাদক ও সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো তাৎক্ষণিকভাবে লাভবান হলেও দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন, উৎপাদন কমে যাওয়া এবং নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব পুরো জ্বালানি খাতের জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে।
কোম্পানিভেদে লাভ-ক্ষতির চিত্র ভিন্ন
মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতার মাত্রা ভিন্ন হওয়ায় মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর ওপর যুদ্ধের প্রভাবও একরকম নয়। Chevron-এর মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা তুলনামূলক কম হওয়ায় উচ্চ তেলের বাজার থেকে প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাচ্ছে।
অন্যদিকে ExxonMobil ও ConocoPhillips-এর মতো কোম্পানিগুলোর মধ্যপ্রাচ্যে বড় বিনিয়োগ রয়েছে। কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে এসব প্রতিষ্ঠানের শত শত কোটি ডলারের যৌথ প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে।
সংঘাতের কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর গ্যাস উত্তোলন প্রায় ৪০ শতাংশ এবং তেল উত্তোলন এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তেলের বাড়তি দাম এই ক্ষতির একটি অংশ পুষিয়ে দিতে পারলেও উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ আয় ও বিনিয়োগ পরিকল্পনায় চাপ তৈরি করছে।
হামলার মুখে তেল-গ্যাস অবকাঠামো
যুদ্ধের প্রভাবে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোও ব্যাপক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন ও সৌদি আরবের বিভিন্ন শোধনাগার, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং গ্যাস কমপ্লেক্সে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে।
কাতার-এনার্জির সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত ExxonMobil-এর গুরুত্বপূর্ণ এলএনজি স্থাপনাগুলোও হামলার শিকার হয়েছে। এতে কয়েকটি স্থাপনায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছে।
জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উৎপাদন স্বাভাবিক করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। একই সঙ্গে অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ ও নিরাপত্তা জোরদারে কোম্পানিগুলোকে বিপুল অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিনিয়োগের ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কোম্পানির অবস্থান প্রশ্নের মুখে
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি খাতে সৌদি আরামকো, আদনকসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। তবে মার্কিন কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও পরিচালনাগত সক্ষমতার মাধ্যমে এ অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
শুধু তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নয়, জ্বালানি খাতের প্রযুক্তি ও পরিষেবা সরবরাহকারী মার্কিন কোম্পানিগুলোও চলমান সংঘাতের কারণে ব্যবসায়িক ঝুঁকিতে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রকল্প স্থগিত বা বিলম্বিত হলে এসব প্রতিষ্ঠানের আয় ও নতুন চুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সামনে বড় অনিশ্চয়তা
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তবে সামরিক সংঘাতের বাস্তবতায় পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বর্তমানে তেলের উচ্চমূল্য মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর কিছুটা আর্থিক সুবিধা দিলেও উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, সরবরাহ সংকট এবং বিনিয়োগ ঝুঁকি দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ততই উচ্চ তেলের দামের সাময়িক সুবিধার চেয়ে অবকাঠামোগত ক্ষতি, উৎপাদন হ্রাস ও বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার প্রভাব বড় হয়ে উঠতে পারে। ফলে পারস্য উপসাগরের অস্থিতিশীলতা শুধু আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ শক্তি কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ ব্যবসার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

