ন্যাশনাল ডেস্ক:
জুলাই আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত গণহত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্তদের অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা জুলাই ফাইন্ডেশনের মাধ্যমে জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের পরিবারের মধ্যে বণ্টনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় দেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।
রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম সোমবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, আসামিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ২৯ জনের সাক্ষ্য উপস্থাপন করেছে। পাশাপাশি আসামিদের কথোপকথনের অডিও রেকর্ড, সেসবের ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং অন্যান্য সহায়ক তথ্য-প্রমাণ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা হয়েছে। এ কারণে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে বলে আশা প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষ।
এর আগে গত ১৭ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হলে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল।
‘আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ’
যুক্তিতর্কে রাষ্ট্রপক্ষের সিনিয়র প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বৈঠকে আন্দোলনকারীদের হত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করা হয়েছিল। মামলায় দাখিল করা বিভিন্ন অডিও-ভিডিওতে এর প্রমাণ রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তার অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন ওবায়দুল কাদের। এর পর সারা দেশে গুলি চালিয়ে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়।
তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী এম হাসান ইমাম এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে তিনি বলেন, জনগণের জানমাল রক্ষায় গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে তার তিন মক্কেল কোনো কমান্ডিং পজিশনে ছিলেন না।
কমান্ড রেসপনসিবিলিটির ক্ষেত্রে তিনি শুধু শেখ হাসিনাকে দায়ী করেন। তার দাবি, তার মক্কেলরা কাউকে হত্যা করেননি এবং হত্যার কোনো নির্দেশও দেননি।
চার নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার
ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চার নেতার পক্ষে যুক্তি খণ্ডন করেন আইনজীবী ইশরাত জাহান। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দমনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে তার চার মক্কেল—সাদ্দাম হোসেন, শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলের নাম আসেনি।
তার দাবি, অন্যরা আন্দোলন দমনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অধীনস্থ নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ব্যর্থ হয়েছেন—রাষ্ট্রপক্ষের এমন বক্তব্যও নাকচ করেন তিনি।
এ সময় ট্রাইব্যুনাল জানতে চায়, কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না। জবাবে আইনজীবী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শুরু থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত বিশৃঙ্খলা চলছিল। ফলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল না।
নারীরা আহত হওয়ার কথা বলা হলেও মামলায় কোনো নারী সাক্ষী আনা হয়নি—এমন যুক্তিও দেন তিনি। সাক্ষ্যপ্রমাণেও এ বিষয়ে কিছু পাওয়া যায়নি দাবি করে চার আসামির খালাস চান তিনি।
‘একই উদ্দেশ্যে অপরাধ করলে সবাই দায়ী’
আসামিপক্ষের যুক্তির জবাবে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’ নীতিতে একই উদ্দেশ্যে একটি গোষ্ঠী অপরাধ করলে সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও ওই গোষ্ঠীর প্রত্যেক সদস্য সমানভাবে দায়ী হতে পারেন।
তার দাবি, প্রথমে ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগকে নির্দেশ দেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হয়। পরে আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর পর সারা দেশে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালানো হয়।
প্রসিকিউটর আরও বলেন, ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে যুবলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কথোপকথনের তথ্য-প্রমাণ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব কথোপকথন থেকে যুবলীগের নেতাকর্মীদের মাঠে থাকার নির্দেশ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলকে মাঠে থেকে হামলার দিকনির্দেশনা দিতে দেখা গেছে।
তামীম বলেন, ব্যাপক হামলা চালালে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হবে—এটি জেনেও ওবায়দুল কাদের হামলার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষ প্রতিটি অভিযোগের পক্ষে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে আসামিদের অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
যেভাবে এগিয়েছে বিচার
মামলাটি প্রথমে ৫/২০২৫ নম্বর মিস কেস হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। গত বছরের ১৮ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তদন্ত শুরু করে। ৭ ডিসেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
যাচাই-বাছাই শেষে ১৮ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। এতে আসামিদের বিরুদ্ধে মোট নয়টি অভিযোগ আনা হয়। একই দিন অভিযোগ আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল।
পরে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি মামলার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করা হয় এবং একই দিন সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
রাষ্ট্রপক্ষ মামলায় মোট ২৯ জন সাক্ষী উপস্থাপন করে। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয় ২ আগস্ট। এরপর ৪ আগস্ট যুক্তিতর্ক শুরু হয়ে ১৭ আগস্ট তা শেষ হয়। সেদিনই মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল।
শেষ পর্যন্ত মামলার রায়ে ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। পাশাপাশি তাদের অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে জুলাই ফাইন্ডেশনের মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবারের মধ্যে বণ্টনের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

