রংপুর প্রতিনিধি:
রংপুর রেলস্টেশনে প্রবেশের সময় ৪৬১ নম্বর কমিউটার ট্রেনের ইঞ্জিন ও একটি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে স্টেশনের তিন নম্বর লাইনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ সময় আতঙ্কে ট্রেন থেকে দ্রুত নামতে গিয়ে অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনার পর তিন নম্বর লাইনে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। তবে স্টেশনের এক ও দুই নম্বর লাইন দিয়ে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখা হয়। পরে লালমনিরহাট থেকে উদ্ধারকারী রিলিফ ট্রেন এসে লাইনচ্যুত ট্রেনটি উদ্ধারে কাজ শুরু করে। বিকেলের মধ্যে উদ্ধার কার্যক্রম শেষ হয়।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, বুড়িমারী থেকে পার্বতীপুরের উদ্দেশে ছেড়ে আসা ৪৬১ নম্বর কমিউটার ট্রেনটি রংপুর স্টেশনের তিন নম্বর লাইনে প্রবেশের সময় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এতে ইঞ্জিনের আটটি চাকা এবং পেছনের একটি বগির দুটি চাকা রেললাইন থেকে পড়ে যায়। তবে এতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লালমনিরহাট থেকে একটি রিলিফ ট্রেন ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে। উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দেন লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগের বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী ধিমান ভৌমিক। রেলের প্রকৌশলী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
তদন্ত কমিটি গঠন
ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগ। কমিটিতে লালমনিরহাটের সহকারী পরিবহণ কর্মকর্তাকে আহ্বায়ক করা হয়েছে।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন সহকারী যান্ত্রিক প্রকৌশলী (ক্যারেজ অ্যান্ড ওয়াগন), লালমনিরহাটের লোকো ইন্সপেক্টর, দিনাজপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী এবং সহকারী যান্ত্রিক প্রকৌশলী (সিগন্যাল অ্যান্ড টেলিকম)। আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী ধিমান ভৌমিক সাংবাদিকদের বলেন, ট্রেনটিকে কেন তিন নম্বর লাইনে নেওয়া হয়েছিল, সেটিসহ দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তে বেরিয়ে আসবে। তদন্তে কারও দায়িত্বে অবহেলা বা কোনো ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, ইঞ্জিনের আটটি চাকা এবং একটি বগির দুটি চাকা লাইনচ্যুত হলেও স্টেশন থেকে বিভিন্ন রুটে ট্রেন চলাচলে বড় ধরনের কোনো প্রভাব পড়েনি। উদ্ধার কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।
লাইনের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন
এদিকে দুর্ঘটনার পর রংপুর রেলস্টেশনের তিন ও চার নম্বর লাইনের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব লাইনে যথাযথ সংস্কার করা হয়নি। অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত পাথরও নেই। ফলে লাইনের দুরবস্থার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রংপুর রেলস্টেশনের এক কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মালবাহী ট্রেন এই লাইন ব্যবহার করলেও এর আগে এমন দুর্ঘটনা ঘটেনি। তার মতে, ট্রেনটিকে তিন নম্বর লাইনে প্রবেশ করানোর আগে লাইনটির বর্তমান অবস্থা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
নির্ধারিত লাইনেই ট্রেনটি নেওয়া হয়েছিল: স্টেশন কর্তৃপক্ষ
তবে ট্রেনটি ভুল লাইনে নেওয়া হয়েছিল এমন অভিযোগ নাকচ করেছেন রংপুর রেলস্টেশনের স্টেশন সুপারিনটেনডেন্ট আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, ৪৬১ নম্বর কমিউটার ট্রেনটির নির্ধারিত পথই ছিল তিন নম্বর লাইন।
তিনি জানান, স্টেশনের পয়েন্ট অতিক্রম করার পর সামনের দিকে গিয়ে ইঞ্জিনের চাকাগুলো লাইনচ্যুত হয়। একই সময় পেছনের একটি বগির কয়েকটি চাকাও রেললাইন থেকে পড়ে যায়।
দুর্ঘটনার পর কুড়িগ্রামের ইঞ্জিনটি কেটে নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট বগিগুলো আলাদা করে এক নম্বর লাইনে সরিয়ে রাখা হয়। এরপর ক্ষতিগ্রস্ত অংশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হলে স্টেশনে ট্রেন চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক হয়।
স্টেশন সুপারিনটেনডেন্ট বলেন, লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। দুর্ঘটনাস্থলের নির্দিষ্ট অংশ ছাড়া রেললাইনের অন্য কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বর্তমানে রংপুর রেলস্টেশনে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

