বিশেষ প্রতিবেদক:
খুলনায় এখন আতঙ্ক শুধু একটি নির্দিষ্ট পাড়া কিংবা থানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একের পর এক খুন, গুলি ও হামলার ঘটনায় নগর ও আশপাশের এলাকায় তৈরি হয়েছে ভয়ের এক অদৃশ্য বলয়। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা যেন প্রশ্ন তুলছে অপরাধীরা কি ক্রমেই আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে?
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, বুধবার সন্ধ্যায় নগরীর লবণচরা থানাধীন আশিবিঘা কালভার্ট এলাকায় মাত্র প্রায় তিন ঘণ্টার ব্যবধানে দুই যুবককে হত্যা করা হয়েছে। মঞ্জুরুল ইসলাম (২২) ও নাজমুল ইসলাম (১৮)। দুজনকেই গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে প্রথমে হামলার শিকার হন মঞ্জুরুল ইসলাম। আশিবিঘা কালভার্ট এলাকার খোকন সানার ছেলে মঞ্জুরুল পেশায় সেন্টারিং মিস্ত্রি ছিলেন। তাকে ছুরিকাঘাত ও গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রথম হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই একই এলাকার কাছাকাছি আবারও গুলির শব্দ। এবার প্রাণ যায় ১৮ বছর বয়সী নাজমুল ইসলামের। তার বাবার নাম মনির শেখ।
একই এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি হত্যাকাণ্ড শুধু দুটি পরিবারের স্বজনদেরই শোকাহত করেনি, বদলে দিয়েছে পুরো এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ। সন্ধ্যার পর যেখানে মানুষের চলাচল থাকার কথা, সেখানে এখন আতঙ্ক। কে কখন হামলার শিকার হন, সেই শঙ্কা।
গত কয়েক দিনের ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে আরও বড় একটি চিত্র সামনে আসে।
১১ আগস্ট দিবাগত রাতে রূপসার নৈহাটী ইউনিয়নে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রূপসা ব্রিকস কার্যালয়ে গুলিতে নিহত হন ফখরুল ইসলাম (৩২)। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ইব্রাহিম কাটাপ্পাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
১৫ আগস্ট রূপসার আইচগাতী ইউনিয়নের দুর্জনীমহল শহীদের মোড়ে আকতার ঢালীর ছেলে জয় ঢালীকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
১৮ আগস্ট রাতে রূপসার নৈহাটী প্রতিবন্ধী স্কুলের সামনে গুলিবিদ্ধ হন মামুন মীর (৩৫)। গুরুতর অবস্থায় তাকে প্রথমে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। পরদিন তার অস্ত্রোপচার হলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
একই দিন দুপুরে রায়েরমহল এলাকায় চার বছরের শিশু মিমকে অপহরণের চেষ্টার অভিযোগে স্থানীয়দের গণপিটুনির শিকার হন রাজু (২৬)। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর সন্ধ্যায় তার মৃত্যু হয়।
এরপর ২০ আগস্ট একই এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে মঞ্জুরুল ও নাজমুল হত্যাকাণ্ড।
অর্থাৎ ঘটনাগুলোকে আলাদা আলাদা বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ছে না। কয়েক দিনের ব্যবধানে খুলনা ও আশপাশের এলাকায় হত্যা, গুলি, ধারালো অস্ত্রের হামলা এবং গণপিটুনির মতো সহিংসতার একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
প্রশ্ন উঠছে, অপরাধীরা কীভাবে এত দ্রুত হামলা চালিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে? প্রকাশ্যে অস্ত্রের ব্যবহার কি বেড়েছে? নাকি পূর্ববিরোধ, আধিপত্য বিস্তার ও অপরাধীচক্রের দ্বন্দ্ব নতুন করে সহিংসতার জন্ম দিচ্ছে?
পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডগুলোর কারণ ও জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত চলছে। লবণচরা থানার ওসি সৈয়দ মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, একই এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই যুবক গুলিতে নিহত হয়েছেন। জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু হয়েছে।
খুলনা সদর থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পরপর এসব ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার। তিনি টাইমস টুডেকে বলেন, খুলনা শহরে এখন আতঙ্ক বিরাজ করছে। তিনি খুলনাকে সন্ত্রাসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করে বিশেষ বাহিনী মোতায়েন, সন্ত্রাসীদের তালিকা করে গ্রেপ্তার এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন।
খুলনার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো শুধু ‘কে কাকে হত্যা করল’—এই প্রশ্নে আটকে থাকলে হয়তো মূল সমস্যাটি আড়ালেই থেকে যাবে।
একটি হত্যাকাণ্ডের পর আরেকটি হত্যাকাণ্ড, একটি গুলির ঘটনার পর আরেকটি গুলি। এভাবে ঘটনাগুলো যখন ধারাবাহিকতায় পরিণত হয়, তখন সেটি কেবল অপরাধের পরিসংখ্যান থাকে না; এটি নগরবাসীর নিরাপত্তাবোধের ওপর সরাসরি আঘাত হয়ে দাঁড়ায়।
আজ যে এলাকায় গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে, কাল সেটি অন্য কোনো এলাকা হতে পারে। আর এই অনিশ্চয়তাই সবচেয়ে বড় আতঙ্ক।
খুলনার মানুষের এখন একটাই প্রশ্ন, পরবর্তী গুলির শব্দ শোনার আগেই কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই সহিংসতার উৎস খুঁজে বের করতে পারবে?
কারণ, একের পর এক লাশ উদ্ধারের পর শুধু মামলা ও গ্রেপ্তার নয় প্রয়োজন অপরাধের কারণ, অস্ত্রের উৎস এবং পেছনের শক্তিকে চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। নইলে আজকের আতঙ্কই কাল খুলনার নতুন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

