স্টাফ রিপোর্টার:
ঝড়-বৃষ্টির রাতে পানিতে ডুবে যাওয়া খোরেরাবাদের ছোট্ট ঘরে বসেই স্বপ্ন দেখেছিলেন নিশিতা মন্ডল। জীবনের কঠিন বাস্তবতা, অভাব-অনটন আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করে একসময় খুলনা শহরে এসে শুরু করেন টিকে থাকার সংগ্রাম। থাকার জায়গা ও পড়াশোনার খরচ জোগাড় করাই যখন কঠিন হয়ে পড়েছিল, তখনই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে এগিয়ে যান তিনি।
সেই সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু হয় তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘রমণী ফ্যাশন’ ও ‘রমণী মেকওভার’-এর।
নিশিতা মন্ডলের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প কেবল ব্যবসায়িক সাফল্যের নয়; বরং প্রতিকূলতাকে জয় করে আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার এক বাস্তব উদাহরণ। অভাবের কাছে হার না মেনে নিজের দক্ষতা, শ্রম ও আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে তিনি ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন নিজের পরিচয়।
ছোটবেলায় মায়ের কাছ থেকে শেখা সেলাইয়ের কাজ এবং রূপচর্চার প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর প্রাথমিক সম্বল। শুরুতে বাকিতে পোশাক এনে বিক্রি করতেন। সীমিত পুঁজি, অনিশ্চিত আয় আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পরিশ্রম করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কখনো অর্থসংকট, কখনো মানুষের অপমানজনক কথা সবকিছুর মধ্যেও নিজের লক্ষ্য থেকে সরে দাঁড়াননি তিনি।
২০১৬ সালে বিয়ের পর স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেন নিশিতা। নিজেদের একটি স্থায়ী পরিচয় তৈরি এবং আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয় তাঁদের সম্মিলিত পথচলা। সময়ের সঙ্গে সেই উদ্যোগই বিস্তৃত হয়েছে ফ্যাশন ও সৌন্দর্যচর্চার জগতে। বর্তমানে নিশিতা মন্ডল একজন উদ্যোক্তার পাশাপাশি প্রশিক্ষক হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি CBT&A Level-4 অ্যাসেসর ও ট্রেইনার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি উপলব্ধি করেছেন, কর্মমুখী শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
নিশিতার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বিভাগীয় শহরগুলোতে ‘রমণী ফ্যাশন’-এর নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা। এর মাধ্যমে মানসম্মত পোশাকের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চান তিনি। এ ছাড়া তরুণ-তরুণী ও নারীদের দক্ষতা উন্নয়নে একটি পূর্ণাঙ্গ স্কিল ডেভেলপমেন্ট ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর। সেখানে কারিগরি প্রশিক্ষণ, সেলাই ও বিউটিফিকেশন বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে চান তিনি, যাতে প্রশিক্ষণ নিয়ে মানুষ নিজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে এবং আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজে পায়।
নিশিতা মন্ডলের এই পথচলা প্রমাণ করে, প্রতিকূল পরিস্থিতি মানুষের সামনে বাধা তৈরি করলেও দৃঢ় মনোবল, পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাস সেই বাধা অতিক্রমের শক্তি জোগাতে পারে। একসময় যে নারী নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে নেমেছিলেন, আজ তিনি নিজের উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি অন্যদের জন্য কর্মসংস্থান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করাই এখন তাঁর আগামীর লক্ষ্য। ব্যক্তিগত সংগ্রাম থেকে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার এই গল্প তাই নতুন করে স্বপ্ন দেখতে চাওয়া নারীদের জন্য হতে পারে অনুপ্রেরণার উৎস।

