টাঙ্গাইল প্রতিনিধি
এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে রাকিবুল ইসলাম (১৮)। স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে উচ্চশিক্ষিত হওয়া, পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করা। সেই স্বপ্ন পূরণের প্রস্তুতি নিতে ঢাকায় কোচিংও করছিল সে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগেই মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণের পর হত্যার শিকার হতে হলো তাকে। নিখোঁজের ২০ দিন পর নীলফামারীর ডিমলা থেকে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে তার মরদেহ। ছেলের ভালো ফলাফলে যে পরিবারে আনন্দের বন্যা বইবার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধুই শোক আর আহাজারি।
রাকিবের বাবা খাদেমুল ইসলাম বলেন, ‘ছেলে জিপিএ-৫ পেয়েছে, এ খবরে আমাদের অনেক আনন্দিত হওয়ার কথা ছিল। স্বপ্ন ছিল, ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, মানুষের মতো মানুষ হবে। কিন্তু তার ফলাফলের আনন্দটুকুও উপভোগ করতে পারলাম না।’
মা জাহুরা বেগম বলেন, ছেলের ভালো ফলাফল নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। ভেবেছিলেন, উচ্চশিক্ষা শেষ করে একদিন ছেলে তাদের মুখ উজ্জ্বল করবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। ফলাফলের আনন্দ উদ্যাপনের আগেই ছেলেকে হারাতে হয়েছে।
রাকিব টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের দাদীর আটা গ্রামের কৃষক খাদেমুল ইসলামের ছেলে। সে ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতির জন্য ঢাকার ফার্মগেট এলাকার একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিল সে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ সেপ্টেম্বর ফার্মগেট এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় রাকিব। এরপর অপরিচিত এক যুবক রাকিবের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে তার বাবার হোয়াটসঅ্যাপে চোখ-মুখ বাঁধা ও নির্যাতনের ছবি পাঠায়। ছেলেকে মুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে ১৬ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়।
ছেলেকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় দরিদ্র কৃষক বাবা ধারদেনা ও সুদে টাকা সংগ্রহ করেন। এরপর ১৩টি বিকাশ নম্বরে মোট চার লাখ টাকা পাঠান অপহরণকারীদের কাছে। কিন্তু টাকা পাওয়ার পরও রাকিবকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। পরে তার কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।
এ ঘটনায় তদন্তে নামে পুলিশ। একপর্যায়ে ঢাকার শুক্রাবাদ এলাকা থেকে মামুন রহমান (২৩) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ছাতনাই ইউনিয়নের বালাপাড়া গ্রামের একটি বাড়িতে মাটি খুঁড়ে বস্তাবন্দি অবস্থায় রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানায়, রাকিবের সঙ্গে মামুনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সেই সূত্রে মামুন তাকে শুক্রাবাদের বাসায় ডেকে নিয়ে আটকে রাখে এবং পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করে। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তির সময় ঘাড়ে আঘাত পেয়ে রাকিবের মৃত্যু হয়। পরে তার মরদেহ কার্টনে ভরে মামুনের গ্রামের বাড়ি ডিমলায় নিয়ে মাটিচাপা দেওয়া হয়। এ ঘটনায় আরও দুজনের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
জিপিএ-৫ পাওয়ার খবরে যে বাড়িতে আনন্দ-উচ্ছ্বাস থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন চলছে শোকের মাতম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখা রাকিবের বাড়ি ফেরা হলো ঠিকই, তবে জীবিত নয় নিথর মরদেহ হয়ে। তার সাফল্যের খবর এখন পরিবারের কাছে আনন্দের নয়, বরং অপূরণীয় বেদনার স্মৃতি।

