স্পোর্টস ডেস্ক:
আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নেমে আবেগঘন বিদায় নিলেন লিওনেল মেসি। বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে নিজে একটি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে দুটি গোল করিয়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। ম্যাচ শেষে বুয়েনস আইরেসের ঐতিহাসিক মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে সমর্থকদের উদ্দেশে আবেগঘন বক্তব্য দেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি।
মেসি বলেন, ‘আজ কী বলব, সেটাই বলা কঠিন। এত আবেগ, এত কিছু মাথার মধ্যে ঘুরছে। প্রথমেই আমার বাবার কথা মনে পড়ছে। বিদায়ী চিঠিতে যেমন বলেছি, এখন আমার করার মতো একটাই কাজ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।’
দুই দশকের বেশি সময় আর্জেন্টিনার জার্সি পরতে পারাকে নিজের জন্য বড় সম্মানের বলে উল্লেখ করে মেসি বলেন, ‘২০ বছরেরও বেশি সময় এই জার্সি পরতে পারা আমার জন্য ছিল অনেক বড় সম্মানের। আমরা যত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেই পড়েছি না কেন, আমি কখনো লড়াই থামাইনি। কখনো নিজের সবটুকু দেওয়া থেকে পিছিয়ে আসিনি, কখনো দলের পাশে থাকা বন্ধ করিনি।’
জাতীয় দলের হয়ে খেলা আর ফিরে আসতে না পারা তাঁর জন্য কষ্টের হবে উল্লেখ করে মেসি বলেন, ‘জীবনের বাকি সময়টাও আমি এখানে ফিরে আসতে চাইব। কারণ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলা একজন ফুটবলারের জীবনে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে সুন্দর বিষয়। আমি চিরকাল এখানে থাকতে চাই। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, এখনই সঠিক সময়।’
নিজের শেষ বিশ্বকাপের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘শেষ বিশ্বকাপটা আমার জন্য অনেক বেশি কিছু ছিল। আমরা আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম, খুব কাছাকাছিও গিয়েছিলাম। সত্যি বলতে, সেখানে অস্বাভাবিক কিছু ঘটেনি। আমরা নিজেদের সবটুকু দিয়েছিলাম। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটা শারীরিক ও মানসিক দুই দিক থেকেই আমাদের জন্য ভীষণ কঠিন ছিল। সত্যি বলতে, আমরা কোনোমতে টিকে ছিলাম।’
জাতীয় দলের সতীর্থদের প্রশংসা করে মেসি বলেন, ‘তবু আমরা সব সময়ের মতোই লড়াই করেছি, এই জার্সির জন্য যেমনটা সব সময় করে এসেছি। যেসব সতীর্থের সঙ্গে এই জার্সি ভাগ করে নিয়েছি, তাদের নিয়েও আমার কোনো সন্দেহ নেই। আমার পাশে থাকা প্রত্যেকেই সব সময় জাতীয় দলের জার্সির জন্য নিজেদের সবটুকু দিয়েছে।’
বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও ফিনালিসিমাসহ বিভিন্ন শিরোপা জয়ের পেছনে সতীর্থদের অবদানের কথা স্মরণ করে মেসি বলেন, ‘এই দলের সঙ্গে যে সময়টা কাটিয়েছি, তার জন্য সতীর্থদের ধন্যবাদ জানাতে চাই। তারা আমাকে ছোটবেলার স্বপ্ন পূরণে সাহায্য করেছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার, আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার, ফিনালিসিমা জেতার এবং আমরা যে প্রতিটি প্রতিযোগিতায় খেলেছি, সেগুলোর চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন। মাঠে ও মাঠের বাইরে তাদের সঙ্গে সময় কাটানো আমার জন্য ছিল বিশাল সম্মানের।’
আর্জেন্টিনার সমর্থকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। মেসির ভাষায়, ‘দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমার, আর সব জায়গাতেই মানুষের কাছ থেকে অসাধারণ ভালোবাসা পেয়েছি। আমি যা কিছু পেয়েছি, যা কিছু অনুভব করেছি, সবকিছুর জন্য আমি কৃতজ্ঞ।’
তিনি বলেন, ‘এই পুরো সময়ে আমি যেখানেই গিয়েছি, স্টেডিয়াম পূর্ণ পেয়েছি। ম্যাচ বিশ্বকাপের হোক, কোপা আমেরিকার হোক কিংবা অন্য কোনো ম্যাচ সব জায়গাতেই মানুষ এসেছে। তারা অনেক কষ্ট করে এসেছে। আর তাই আমাদের সব সময় মনে হয়েছে, আমরা যেন দেশের প্রতিটি জায়গাতেই নিজেদের ঘরের মাঠে খেলছি। আমরা সত্যিই সেটা অনুভব করেছি।’
আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের পর মনুমেন্তালে ফিরে খেলার স্মৃতিকে নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন মেসি। তিনি বলেন, ‘এখানেই আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আনন্দের দিনগুলোর একটি কাটিয়েছি বিশ্বকাপ জেতার পর যখন আমরা আবার খেলতে নেমেছিলাম। সেদিনের অনুভূতি আমি কখনো ভুলব না। দিনটি ছিল অসাধারণ।’
সেই স্মৃতি এখনো তাঁকে আবেগাপ্লুত করে জানিয়ে মেসি বলেন, ‘এখনো আমি সেদিনের ভিডিও দেখি, আর আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। সেই দিনটি চিরকাল আমার ইতিহাসে, আমার সতীর্থদের ইতিহাসে এবং আমার পরিবারের ইতিহাসে লেখা থাকবে। এর জন্য আপনাদের অনেক ধন্যবাদ।’
এরপরই বিদায়ের কঠিন মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে মেসি বলেন, ‘আর আজ, আবার এখানে ফিরে এসে, সম্ভবত আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কষ্টের দিনটি অনুভব করছি। কারণ আজই আমি জাতীয় দল এবং আপনাদের সবাইকে বিদায় বলছি।’
তবে জাতীয় দলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জাতীয় দলের রং ধারণ করে খেলা আমি ভীষণ মিস করব। তবে এখন থেকে আমি থাকব আপনাদের পাশে, আপনাদের সঙ্গেই। এই ছেলেদের এবং এরপর যা কিছু আসবে, সবকিছুকে সমর্থন করব। আমরা সব সময় একসঙ্গে থাকব।’
দলের ঐক্যকে সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি হিসেবে উল্লেখ করে মেসি বলেন, ‘এটা বারবার প্রমাণ হয়েছে, যখন আমরা একসঙ্গে থাকি, ঐক্যবদ্ধ থাকি, তখন আমরা যে কারও চেয়ে শক্তিশালী। যেকোনো বাধা পেরিয়ে যেতে পারি। সামনে কঠিন সময় আসবে, এটা নিশ্চিত। কারণ এই সময়ে আমরা যা অর্জন করেছি, তা স্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। আর সেই কঠিন সময়ে আমাদের আগের চেয়েও বেশি তাদের পাশে থাকতে হবে।’
জাতীয় দলকে ঘিরে সমালোচনা ও ব্যর্থতা প্রত্যাশী মহলের কথাও উল্লেখ করেন মেসি। তিনি বলেন, ‘বড় লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ দল গড়ে তুলতে হয়। কারণ এমন কিছু মানুষ আছে, যারা জাতীয় দলকে ব্যর্থ হতে দেখতে চায়। আমরা তাদের সেই সুযোগ দিতে পারি না।’
কঠিন সময়েই একটি দলের প্রকৃত শক্তি বোঝা যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কঠিন সময়, খারাপ সময়েই আসলে বোঝা যায় একটি দল কী দিয়ে তৈরি। যখন শক্তিশালী দল থাকে না, তখন কোনো কিছু অর্জন করা খুব কঠিন।’
নিজেদের দলকে অসাধারণ উল্লেখ করে মেসি বলেন, ‘আমি আপনাদের বলতে পারি, আমরা ছিলাম অসাধারণ একটি দল। আর এ কারণেই আমরা এত কিছু অর্জন করতে পেরেছি।’
বিদায়ের মুহূর্তে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, আজ আমি অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কথা বলছি। আমি যেতে চাই না। আমি মাঠ ছাড়তে চাই না।’
শেষে আর্জেন্টিনার মানুষ ও সমর্থকদের উদ্দেশে মেসি বলেন, ‘শুধু এটুকু বলতে চাই, আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি। আপনাদের খুব মিস করব। আর ঈশ্বরের কাছে আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ যে আমি একজন আর্জেন্টাইন।’
নিজের পরিচয় নিয়ে গর্ব প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমি আর্জেন্টাইন হতে পেরে গর্বিত। আপনাদের সবার সঙ্গে আমার স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পেরেছি, এ জন্যও আমি গর্বিত।’
সমর্থকদের উদ্দেশে মেসির শেষ কথা ছিল, ‘আপনাদের সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আমি আপনাদের ভালোবাসি।’

