ন্যাশনাল ডেস্ক:
বাংলাদেশকে আর পিছিয়ে রাখা যাবে না উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশের মানুষের জীবনমান বদলে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, এখন জনগণের জন্য কাজ করার সময়। দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করতে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে।
রোববার চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাহারছড়া সমুদ্র উপকূলে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন কর্মসূচিতে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
বাঁশখালী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বন্যায় ঘরবাড়ি হারানো ১০০ পরিবারের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেন তিনি। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণ ও আর্থিক সহায়তা বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বক্তব্য দেন।
কাজ ও পরিশ্রমেই বদলাবে দেশের ভাগ্য
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশ একসময় বাংলাদেশের চেয়েও পিছিয়ে ছিল। কিন্তু পরিকল্পিত উন্নয়ন, কঠোর পরিশ্রম ও মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা নিজেদের অবস্থান বদলে নিয়েছে। বাংলাদেশকেও একইভাবে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের মানুষের জীবনমান উন্নত করা এবং জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। এ জন্য শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না; দেশের প্রতিটি মানুষকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত হতে হবে।
মিরসরাই থেকে মাতারবাড়ী শিল্পায়নের মহাপরিকল্পনা
চট্টগ্রামের বিশাল সমুদ্র উপকূলকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। মিরসরাই থেকে মাতারবাড়ী পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমুদ্রসম্পদ ও উপকূলীয় অঞ্চলের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। এ অঞ্চলে মিল-কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি বেকারত্ব কমানো এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথও তৈরি হবে।
চীন সফরের প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, দেশটির বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে শিল্প স্থাপন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কয়েকশ মিল-কারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামের বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পাঁচ বছরে উপজেলা হাসপাতাল হবে ১০০ শয্যার
স্বাস্থ্যসেবাকে সাধারণ মানুষের আরও কাছে পৌঁছে দিতে উপজেলা পর্যায়ের ৫০ শয্যার হাসপাতালগুলোকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এই উন্নীতকরণের কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়বে এবং মানুষের চিকিৎসার জন্য শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব
সরকার গঠনের পর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তরুণ ও যুবসমাজের কর্মসংস্থান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে দেশের সব মানুষের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র বাড়াতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের প্রতিটি মানুষকে উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে। মানুষের শ্রম ও দক্ষতাকে কাজে লাগাতে পারলেই ব্যক্তি, পরিবার এবং দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
৪১ লাখ পরিবার পাবে ফ্যামিলি কার্ড
নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে সরকারের নেওয়া ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি জানান, পাইলট প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ১৬ তারিখ থেকে ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সারাদেশে প্রায় ৪১ লাখ পরিবারের হাতে এই কার্ড তুলে দেওয়া হবে।
বাঁশখালী উপজেলার ১০ থেকে ১২ হাজার পরিবারও এ কর্মসূচির আওতায় আসবে বলে জানান তিনি। আগামী চার বছর ধরে কার্যক্রমটি চলবে এবং পর্যায়ক্রমে আরও পরিবারকে এর আওতায় আনা হবে।
কৃষক কার্ডের আওতায় আসবেন লবণ চাষিরাও
বাঁশখালীর লবণ চাষিদের জন্যও সহায়তার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কৃষক কার্ডের সুবিধা শুধু ধান, শাকসবজি বা অন্যান্য কৃষিপণ্যের চাষিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; লবণ চাষিরাও এর আওতায় আসবেন।
লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, লবণ চাষিরা যাতে উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পেয়ে স্বাবলম্বী হতে পারেন, সে লক্ষ্যে আলোচনা করে একটি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। শিগগিরই নির্ধারিত মূল্য প্রকাশ করা হবে বলে জানান তিনি।
বিনিয়োগের জন্য দরকার স্থিতিশীল পরিবেশ
শিল্পায়ন ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীরা এমন পরিবেশ চান যেখানে তাদের কারখানার উৎপাদিত পণ্য নিরাপদে বন্দরে পৌঁছাতে পারে এবং প্রয়োজনীয় কাঁচামাল নির্বিঘ্নে কারখানায় পৌঁছায়। কোনো এলাকায় অস্থিরতা দেখা দিলে ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হয়, দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে দেশের শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে নতুন ঘর
সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টিতে বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্ট বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বন্যায় বহু মানুষের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে এদিন ১০০ পরিবারের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ও অসহায় মানুষের মধ্যে আর্থিক সহায়তা এবং কিছু পরিবারের মধ্যে খাদ্য সহায়তাও দেওয়া হয়েছে।
উপকূলীয় মানুষের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য বাঁশখালীতে বেড়িবাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, উপকূলীয় এলাকার সুরক্ষায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ সরকারের পরিকল্পনার অংশ এবং শিগগিরই এর কাজ শুরু হবে।
ফটিকছড়িতে প্রধানমন্ত্রীর পরবর্তী কর্মসূচি
বাঁশখালীর কর্মসূচি শেষে হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহর সঙ্গে তার সাক্ষাতের কথা রয়েছে।
বাঁশখালীর কর্মসূচিতে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী মূলত কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, কৃষি উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা এবং উপকূলীয় নিরাপত্তাকে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

