বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ যোগাযোগ আমাদের পরিচয়
English
সর্বশেষ খুলনা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার আজকের নামাজের সময়সূচি ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ● নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এমপি হেলাল দিঘলিয়ার সারোয়ার খান কলেজ সরকারিকরণের উদ্যোগ ● বৃষ্টির শঙ্কায় বাংলাদেশ-চীন ম্যাচ, পরিত্যক্ত হলে সেমিফাইনালে বাংলাদেশ ● নতুন কুঁড়ির ৩০৬ প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদকে বিকেএসপিতে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ সরকারের ● ভূমি অফিসে হাজিরা নিশ্চিত করতে চালু হচ্ছে ‘ভূমিদৃষ্টি’ অ্যাপ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

যেভাবে হয়েছিল ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

ন্যাশনাল ডেস্ক:

সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় হারিয়ে যাওয়া সেই দৃশ্য ফিরছে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর। এবার রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় ভোটের প্রয়োজন হচ্ছে। আর এই নির্বাচনকে ঘিরে আবারও সামনে আসছে ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবরের সেই ঘটনা যেদিন জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষই পরিণত হয়েছিল ভোটকেন্দ্রে, আর প্রকাশ্য ভোটের বিধান নিয়ে তৈরি হয়েছিল তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা।

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে এইচ এম এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। পরের বছর অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। আওয়ামী লীগ সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসে। সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রশ্নে সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটের আয়োজন করা হয়।

সেই নির্বাচন শুধু একজন রাষ্ট্রপতি বেছে নেওয়ার ভোট ছিল না; এটি ছিল নবফেরত সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষাও।

সংসদ কক্ষেই ভোটের লড়াই

১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী।

তৎকালীন সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনসহ মোট ভোটার ছিলেন ৩৩০ জন। ভোটাধিকার থাকা সত্ত্বেও সবাই ভোট দেননি। ভোট দেন ২৬৪ জন সংসদ সদস্য, আর ৬৬ জন ভোটদান থেকে বিরত থাকেন।

শেষ পর্যন্ত ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট।

সংখ্যার হিসাবে ফলাফল স্পষ্ট হলেও ভোটগ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া ছিল রাজনৈতিক বিতর্ক ও উত্তেজনায় ভরপুর।

স্পিকারের আসনে বসেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য আলাদা কোনো ভোটকেন্দ্র করা হয়নি। জাতীয় সংসদের মূল অধিবেশন কক্ষকেই সাজানো হয়েছিল ভোটকেন্দ্র হিসেবে।

স্পিকারের জন্য নির্ধারিত বড় চেয়ারটির পরিবর্তে সেখানে বসানো হয় একটি ছোট চেয়ার। সেই আসনেই দায়িত্ব পালন করেন তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আব্দুর রউফ। তার তত্ত্বাবধানেই শুরু হয় ভোটগ্রহণ।

দুপুর ২টায় ভোট শুরু হওয়ার পর সংসদ সদস্যরা একে একে ভোট দিতে থাকেন। অধিবেশন কক্ষের ভেতরেই স্থাপন করা হয়েছিল একাধিক ভোট বুথ। নির্বাচন কর্মকর্তারা বুথে দায়িত্ব পালন করছিলেন, আর সংসদ সদস্যরা নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছিলেন। কিন্তু ভোট শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই সংসদের স্বাভাবিক পরিবেশ বদলে যায়।

‘শেইম, শেইম’ সংসদের ভেতরেই প্রতিবাদ

প্রকাশ্য ভোটের পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আওয়ামী লীগের কয়েকজন সংসদ সদস্য সংসদ কক্ষে প্রতিবাদ শুরু করেন। মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম, সাজেদা চৌধুরীসহ বিরোধী দলের নেতারা ভোটের গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

তাদের অভিযোগ ছিল, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা প্রকাশ্যে ভোট দেওয়ায় কে কোন প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছেন, তা দলীয় নেতা ও সংশ্লিষ্টদের কাছে দৃশ্যমান হয়ে পড়ছে। এতে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা কার্যত প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

প্রতিবাদের একপর্যায়ে সংসদ কক্ষে হট্টগোল শুরু হয়। বিরোধী দলের সদস্যরা ‘শেইম, শেইম’ বলে স্লোগান দেন।

একদিকে ভোটগ্রহণ চলছে, অন্যদিকে ভোটের পদ্ধতি নিয়েই সংসদের ভেতরে চলছে রাজনৈতিক প্রতিবাদ—১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে অন্যসব নির্বাচনের চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল এই দৃশ্য।

বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল প্রকাশ্য ভোট

বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনগুলোতে ভোটের গোপনীয়তা একটি মৌলিক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার পদ্ধতি ছিল ভিন্ন।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে অনুসৃত প্রকাশ্য ভোটের নিয়ম নিয়ে বিরোধী দলের আপত্তি ছিল তীব্র। তাদের বক্তব্য ছিল, সংসদ সদস্যের ভোট কোন প্রার্থীর পক্ষে গেল, তা দৃশ্যমান হলে স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবে সব বিতর্ক ও উত্তেজনার মধ্যেই শেষ হয় ভোটগ্রহণ। গণনা শেষে আবদুর রহমান বিশ্বাসকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয় এবং তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তারপর ৩৫ বছরের দীর্ঘ নীরবতা

১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোটের পরিস্থিতি আর তৈরি হয়নি।

পরবর্তী প্রায় সাড়ে তিন দশকে একাধিকবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই একজন প্রার্থী থাকায় সংসদ সদস্যদের ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছে, কিন্তু ভোটের দিন সংসদ কক্ষকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়নি ১৯৯১ সালের মতো কোনো নির্বাচনী আবহ।

অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান ছিল, সংসদ সদস্যরাও ভোটার ছিলেন, কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় ভোটগ্রহণের দৃশ্যটি ধীরে ধীরে ইতিহাসের পাতায় চলে যায়।

এবার ফিরছে সেই দৃশ্য

দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর আবারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ফলে এবার সংসদ সদস্যদের ভোটেই নির্ধারিত হবে দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি।

এবার বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদ।

ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবার শুধু সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকছে না; দীর্ঘ বিরতির পর এটি আবারও পরিণত হচ্ছে সরাসরি ভোটের লড়াইয়ে।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, নাকি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়?

১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল গণতন্ত্রে ফিরে আসার পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায়। আর ৩৫ বছর পরের নির্বাচন হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে।

তবু দুটি নির্বাচনের মধ্যে একটি জায়গায় মিল রয়েছে—দুটিই নির্ভর করছে সংসদ সদস্যদের ভোটের ওপর।

১৯৯১ সালে সংসদ কক্ষের ভেতরে বসেছিল ভোটের বুথ, স্পিকারের আসনের সামনে বসেছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার, আর প্রকাশ্য ভোটের পদ্ধতি নিয়ে উঠেছিল ‘শেইম, শেইম’ স্লোগান।

এবারের নির্বাচন সেই ইতিহাসকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। প্রায় ৩৫ বছর পর প্রশ্ন একটাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট কি শুধু নতুন একজন রাষ্ট্রপতি বেছে নেবে, নাকি আবারও বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে যোগ করবে নতুন কোনো স্মরণীয় অধ্যায়?

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

একটি মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Notice: ob_end_flush(): Failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/modhumot/public_html/wp-includes/functions.php on line 5493