পটুয়াখালী প্রতিনিধি:
পটুয়াখালীর আলীপুর-মহিপুরের ব্যস্ততম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের প্রবেশপথ খাপড়াভাঙা নদী। বছরের পর বছর নাব্যতা সংকটে জেলেদের দুর্ভোগের অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছে এই নদী। সেই নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে জেলেদের দীর্ঘদিনের দাবির কথা শুনলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান।
দিলেন নদী ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস। একই সঙ্গে বৈরী আবহাওয়ায় সমুদ্রে থাকা জেলেদের নিরাপত্তায় এলাকায় একটি লাইটিং হাউস বা বাতিঘর স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
রবিবার (২৩ আগস্ট) পটুয়াখালীর মহিপুরে ‘নৌযান শুমারি-২০২৬’ কার্যক্রম পরিদর্শন ও জেলেদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তবে এদিনের কর্মসূচিতে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের বাইরেও ছিল একটি ভিন্ন দৃশ্য। খাপড়াভাঙা নদী ও জেলেদের মাছ ধরার ট্রলার পরিদর্শনের সময় দুপুরের খাবারের সময় হয়ে যায়। জেলেরা তাদের ট্রলারে রান্না করা ভাত-তরকারি খাওয়ার জন্য প্রতিমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানান। তিনি সেই আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেননি। বরং জেলেদের সঙ্গে একই ট্রলারে বসে তাদের রান্না করা খাবার খান।
এই অনানুষ্ঠানিক মধ্যাহ্নভোজের মধ্য দিয়েই জেলেদের সঙ্গে প্রতিমন্ত্রীর সরাসরি কথোপকথনের সুযোগ তৈরি হয়। তাদের জীবনযাপন, নদীর নাব্যতা সংকট, ট্রলার চলাচল এবং সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে নানা ঝুঁকির বাস্তব চিত্র কাছ থেকে শোনেন তিনি।
খাপড়াভাঙায় ড্রেজিং, সমুদ্রে বাতিঘরের উদ্যোগ
জেলেদের দীর্ঘদিনের দাবি খাপড়াভাঙা নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জেলেদের সুবিধার্থে নদীটিতে ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পাশাপাশি বৈরী আবহাওয়ায় গভীর সমুদ্রে থাকা জেলেদের নিরাপত্তার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। এ জন্য এলাকায় একটি লাইটিং হাউস বা বাতিঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মৎস্যভিত্তিক এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও নৌযান চলাচলের সঙ্গে খাপড়াভাঙা নদীর গুরুত্ব তুলে ধরে সংশ্লিষ্টরা জানান, নদীর নাব্যতা সংকট নিরসন হলে আলীপুর-মহিপুরের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে এবং জেলেদের ট্রলার চলাচলের দুর্ভোগ কমবে।
ট্রলিং ট্রলার বন্ধে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান
মতবিনিময় সভায় ট্রলিং ট্রলারের প্রসঙ্গও উঠে আসে। এ বিষয়ে সবাইকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ট্রলিং ট্রলারের বিষয়টি নিয়ে দিনশেষে অভিযোগের তীর রাজনৈতিক দলের দিকেই আসে।
তিনি বলেন, ট্রলিং ট্রলার বন্ধ না হলে দেশের ক্ষতি হবে, মানুষের ক্ষতি হবে, নেতৃত্বেরও ক্ষতি হবে। সর্বোপরি ভোটের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়বে।
সামনে বেশ কয়েকটি নির্বাচন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষের কাছে ভোট চাইতে হবে। অথচ জেলেদের ক্ষতি করে এমন কোনো কর্মকাণ্ড চলতে দেওয়া হলে ভবিষ্যতে মানুষের কাছে যাওয়ার পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, “মানুষের অনুভূতিগুলো নিয়ে আমরা কাজ করব। আশা করি, সবাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন।”
নৌযানের তথ্যভাণ্ডার তৈরিতে দেশব্যাপী শুমারি
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন নৌপরিবহন অধিদপ্তরের ‘নৌযানের ডাটাবেইজ তৈরি ও নৌযান ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে পরিচালিত হচ্ছে ‘নৌযান শুমারি-২০২৬’।
এই কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের নৌযানের হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করে একটি সমন্বিত ডাটাবেইজ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই তথ্যভাণ্ডার নৌযান ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর ও সুশৃঙ্খল করতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে নৌখাতের উন্নয়ন, জেলেদের নিরাপত্তা এবং নৌযান চলাচল ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নদী ঘুরে দেখলেন প্রতিমন্ত্রী
দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মো. শফিউল বারী।
এসময় পায়রা বন্দরের সদস্য কমডোর তারেক, মহিপুর থানা বিএনপির সভাপতি আ. জলিল হাওলাদার, আলীপুর-মহিপুর মৎস্য আড়ত মালিক সমিতির নেতারা, স্থানীয় জেলে ও ট্রলার মালিক, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দলের নেতা এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
মতবিনিময় সভা শেষে প্রতিমন্ত্রী খাপড়াভাঙা নদী পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি নদীর নাব্যতা সংকট, জেলেদের ট্রলার চলাচল এবং মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রকে ঘিরে বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন।
জেলেদের প্রত্যাশা এখন একটাই—প্রতিশ্রুতির পর দ্রুত বাস্তবায়ন। খাপড়াভাঙা নদীর নাব্যতা ফিরলে যেমন সহজ হবে শত শত মাছ ধরার ট্রলারের চলাচল, তেমনি একটি আধুনিক বাতিঘর বাস্তবায়িত হলে বৈরী আবহাওয়ায় সমুদ্রে থাকা জেলেদের নিরাপত্তায় যোগ হবে নতুন আশ্বাস।

