চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়েছে ৫৫তম ঐতিহাসিক জশনে জুলুস। বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নগরের ষোলশহর জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসাসংলগ্ন আলমগীর খাঁনকা-এ কাদেরিয়া সৈয়্যদিয়া থেকে জুলুসের কার্যক্রম শুরু হয়। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ধর্মপ্রাণ লাখো মুসলমান অংশ নেন বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা।
এবারের জুলুসে নেতৃত্ব দেন দরবারে সিরিকোটের সাজ্জাদানশীন পীর আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সাহেবজাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ কাসেম শাহ ও শাহজাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ আকিব শাহ।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, জুলুসটি মুরাদপুর, ২ নম্বর গেট, জিইসি মোড়, ওয়াসা, দামপাড়া, লালখান বাজার ও টাইগারপাসসহ নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদরাসা মাঠে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে মাহফিল, জোহরের নামাজ এবং দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি কামনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, জশনে জুলুসে অংশ নিতে বুধবার ভোর থেকেই চট্টগ্রাম নগর ও আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ষোলশহর ও মুরাদপুর এলাকায় জড়ো হতে থাকেন। চট্টগ্রামের পাশাপাশি কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়িসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা এবং আঞ্জুমান পরিচালিত প্রায় ৩০০ মাদরাসা থেকেও বিপুলসংখ্যক মানুষ বন্দরনগরীতে আসেন।
বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনে এবং পায়ে হেঁটে অংশগ্রহণকারীরা জুলুসে যোগ দেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নগরের বিভিন্ন সড়কে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। অংশগ্রহণকারীদের হাতে কালেমাখচিত পতাকা এবং মাথায় বিশেষ টুপি দেখা যায়। লাখো আশেকে রাসুল হামদ, নাত, দরুদ ও স্লোগানে কণ্ঠ মিলিয়ে জুলুসে অংশ নেন।
জুলুসকে কেন্দ্র করে অনেককে স্বউদ্যোগে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে শরবত, খেজুর, কলা, রুটি, পানি ও জিলাপি বিতরণ করতে দেখা যায়। এ ছাড়া জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদরাসার সামনের সড়ক থেকে ষোলশহর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ঐতিহ্যবাহী নানা পণ্যের মেলাও বসে। সেখানে আতর, টুপি, তসবিহ, পাঞ্জাবি, ইসলামি বই, খাবার, শরবত, দেশি ফলমূল, চা-নাশতা, বিরিয়ানি, পতাকা, মাথার ফিতা ও ব্যাজসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করা হয়।
আঞ্জুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এবারের জুলুসে লাখ লাখ মানুষের সমাগম হয়েছে বলে দাবি করেছেন আয়োজকেরা। তাঁদের ভাষ্য, শান্তি, মানবতা, অহিংসা এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শের বার্তা ছড়িয়ে দিতেই এ আয়োজন করা হয়েছে।
জুলুস উপলক্ষে এক সপ্তাহ আগে থেকেই নগরের বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় তোরণ, ব্যানার, ফেস্টুন ও সবুজ পতাকায় সাজানো হয়। ষোলশহর, মুরাদপুর, জিইসি মোড়, ওয়াসা, লালখান বাজার ও টাইগারপাস এলাকায় নির্মাণ করা হয় নানা আকৃতির তোরণ।
জুলুসের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আঞ্জুমান ট্রাস্টের প্রায় ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করেন। মুসল্লিদের সুবিধার্থে মাদরাসা ও আশপাশের এলাকায় শতাধিক অস্থায়ী শৌচাগার স্থাপন করা হয়। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশও জুলুসকে কেন্দ্র করে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
জশনে জুলুসে নেতৃত্বদানকারী আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ বলেন, “ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) কেবল একটি আয়োজন নয়, এটি প্রিয়নবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও ভক্তি প্রদর্শনের এক অনুপম মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন বিশ্বজাহানের জন্য রহমত হিসেবে। তাঁর শিক্ষা ছিল শান্তি, সম্প্রীতি, মানবতা এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা।”
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বের অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা দূর করতে মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ ও সুফি-সুন্নী চেতনার আলোকে জীবন পরিচালনার আহ্বান জানানো হয়েছে। গিবত, হিংসা-দ্বেষ ও অন্যায় পরিহার করে অন্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মহব্বত জাগ্রত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
আঞ্জুমানে রহমানিয়া সুন্নিয়া আলিয়া ট্রাস্টের মুখপাত্র অ্যাডভোকেট মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার বলেন, “বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ধরায় আগমন উপলক্ষে আনন্দ মিছিল বা জশনে জুলুস উদযাপন একটি সুন্নত ও অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।”
তিনি বলেন, কোটি কোটি আশেকে রাসুল ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দের সঙ্গে এ ধরনের শোভাযাত্রায় অংশ নেন। তবে এ আয়োজন নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর জন্যও তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান।
আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালে আওলাদে রাসুল আল্লামা হাফেজ সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ (র.)-এর দিকনির্দেশনায় চট্টগ্রামে প্রথম জশনে জুলুসের আয়োজন করা হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, “জশনে জুলুসের মতো বড় সমাবেশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের বড় দায়িত্ব। শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।”

