খুলনা প্রতিনিধি:
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেছেন, শুধু জিপিএ-৫ বা এ প্লাস পেলেই হবে না; মেধার পাশাপাশি সততা, দক্ষতা ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে তরুণদের নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মের কাঁধে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকালে খুলনার রূপসা উপজেলা সদরের কাজদিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে রূপসা ও বটিয়াঘাটা উপজেলা ছাত্রশিবির আয়োজিত জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, এ প্লাস জীবনের প্রথম ধাপের সাফল্য, চূড়ান্ত অর্জন নয়। আবার এ প্লাস না পেলেও হতাশ হওয়ার কারণ নেই। সামনে নিজেকে দক্ষ ও যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলার অনেক সুযোগ রয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতি ও শিল্পের দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তরুণদের চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
তরুণদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন তোমাদের টিকটক আর ফেসবুক করার সময় নেই। এগুলোর মতো হাজারো প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।’ মেধা, সততা ও দেশপ্রেমকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার আহ্বান জানান তিনি।
মেধার সঙ্গে সততার গুরুত্ব তুলে ধরে ছাত্রশিবির সভাপতি বলেন, শুধু মেধা থাকলেই হবে না, সততা না থাকলে সেই মেধা সমাজের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। সরকারি সেবা খাতে অনিয়ম ও ঘুষের সমালোচনা করে তিনি জনগণের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করতে জবাবদিহি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন।
দেশপ্রেমের উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি তুরস্কের এক পিএইচডি গবেষকের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরে পড়াশোনা শেষে বেশি বেতনের চাকরির সুযোগ পেয়েও ওই গবেষক নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, অর্থের চেয়ে চিন্তা, মেধা, মনন ও দেশপ্রেমই মানুষকে বড় করে।
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জনের চেয়ে পরীক্ষায় ভালো ফল করার দিকে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছে। গাইডনির্ভর পড়াশোনার কারণে শিক্ষার্থীদের মৌলিক জ্ঞান ও সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক করার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারি বাজেট ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রসঙ্গে ছাত্রশিবির সভাপতি বলেন, বিভিন্ন খাতে বিপুল অর্থ বরাদ্দ থাকলেও প্রকৃত উপকারভোগীরা সবসময় এর সুফল পান না। উন্নয়ন বাজেটের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তা জনগণের সামনে প্রকাশ করা হলে জবাবদিহি বাড়বে। প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলায় কোন খাতে কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশেরও দাবি জানান তিনি।
দুর্নীতির অভিযোগ গ্রহণে অনলাইন ব্যবস্থা চালুর পক্ষে মত দিয়ে নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, সাধারণ মানুষ ঘুষ ও অনিয়মের তথ্য দেওয়ার সুযোগ পেলে রাষ্ট্র সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। দুর্নীতি বন্ধে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নারীদের জন্য সুযোগের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ছেলে-মেয়ে সবাইকে নিয়েই বাংলাদেশ। দেশের অগ্রগতিতে সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ধর্ম মানুষকে ন্যায়, মানবিকতা, সত্য ও শৃঙ্খলার পথে চলতে শেখায়।
চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন ধরনের ‘সিন্ডিকেট’ নিয়ে সমালোচনা করে ছাত্রশিবির সভাপতি বলেন, চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের জীবন স্বাভাবিক হতে পারে না। বাজার ও চাকরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের কারণে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। দেশের দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্য ও উন্নয়ন কাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দেন তিনি।
সরকারি কর্মকর্তাদের জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের সেবা করার জন্যই সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। তাই সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ যাতে হয়রানি বা অনিয়মের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
ছাত্রশিবিরের কার্যক্রম প্রসঙ্গে নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ছাত্র ও তরুণ সমাজকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে। তিনি দাবি করেন, ছাত্রশিবির কাউকে প্রলোভন দেখিয়ে সংগঠনে যুক্ত করে না। সংগঠনের নেতাকর্মীরা নিজেদের উপার্জিত অর্থ ও পরিবারের সহায়তায় সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
তিনি আরও বলেন, তরুণদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে এবং মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করতে হবে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও দক্ষতার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার উপযোগী করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে রূপসা পশ্চিম থানা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুরসালীন আকনের সভাপতিত্বে ও বটিয়াঘাটা পূর্ব থানা সভাপতি গালিব হাসানের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন খুলনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যক্ষ মাওলানা কবিরুল ইসলাম, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক স ম এনামুল হক, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক হাফেজ ইউসুফ ইসলাহী, খুলনা জেলা উত্তর ছাত্রশিবিরের সভাপতি মমিনুর রহমান ও সেক্রেটারি আবু জাফরসহ স্থানীয় জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের নেতারা।
অনুষ্ঠানে রূপসা ও বটিয়াঘাটা উপজেলার জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
পরে নূরুল ইসলাম সাদ্দাম রূপসা উপজেলার নৈহাটি স্কুলে ছাত্রশিবিরের ‘সাথী সমাবেশে’ প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। এতে জেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মমিনুর রহমানের সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারি আবু জাফরের সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথি ছিলেন কেন্দ্রীয় কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক হাফেজ ইউসুফ ইসলাহী।

