খুলনা প্রতিনিধি
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ওষুধের দোকানগুলোতে নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) অনুযায়ী ওষুধ বিক্রির নির্দেশনা ঘিরে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। রোগী ও তাঁদের স্বজনদের অভিযোগ, আগে তুলনামূলক কম দামে পাওয়া কিছু ওষুধ এখন বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়া সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে।
মায়ের চিকিৎসা করাতে বাগেরহাটের চিতলমারী থেকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন রাহমাতুল্লাহ। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে গিয়ে বাড়তি খরচের মুখে পড়েছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, কয়েক দিন আগেও যে মেরোজেক্ট ইনজেকশন ৭১০ থেকে ৭২০ টাকায় কিনেছিলেন, সেটি এখন কিনতে হয়েছে ৯১০ টাকায়।
রাহমাতুল্লাহ বলেন, জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে হাসপাতালের সামনের দোকান থেকেই ওষুধ কিনতে হচ্ছে। দামের বিষয়ে আপত্তি থাকলেও বিকল্প না থাকায় কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের অনেকটা জিম্মি করেই এই দাম রাখা হচ্ছে।’
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আরও কয়েকজন রোগী ও তাঁদের স্বজন। তাঁদের দাবি, হাসপাতালের সামনের ওষুধের দোকানগুলোতে কিছু ওষুধের দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। এতে চিকিৎসার জন্য আসা অসচ্ছল রোগীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
এ পরিস্থিতির মধ্যে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গেটসংলগ্ন ওষুধ ব্যবসায়ী সমিতির একটি জরুরি বিজ্ঞপ্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আগামী ১১ অক্টোবর সকাল ৬টা থেকে সব ওষুধ নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) অনুযায়ী বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি সমিতির সিদ্ধান্ত ও নিয়মাবলি মেনে ঐক্যবদ্ধভাবে ব্যবসা পরিচালনার জন্য সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করেছেন সমিতির সভাপতি শেখ ফরহাদ হোসাইন এবং এমআরপি বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মোহাম্মদ আসিফুজ্জামান।
সমিতির এই সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা। তাঁদের প্রশ্ন, ওষুধের নির্ধারিত মূল্য কার্যকর করার ক্ষেত্রে রোগীদের স্বার্থ এবং প্রচলিত মূল্যছাড়ের সুযোগ কীভাবে বিবেচনা করা হবে। তবে ওষুধের দাম বৃদ্ধির অভিযোগ এবং সমিতির সিদ্ধান্তের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
খালিশপুরের এক রোগীর ভাই মো. আফরোজও ওষুধের দামের পার্থক্যের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আগে যে ট্রাকশন ইনজেকশন ১১০ থেকে ১২০ টাকায় কিনতেন, সেটি এখন ১৯০ টাকায় কিনতে হয়েছে। একইভাবে, আগে গ্যাসের ওষুধ ৬০ টাকায় কিনলেও এখন দিতে হচ্ছে ৯০ টাকা।
আফরোজ বলেন, ‘এভাবে আমাদের জিম্মি করা হলে আমরা যাব কোথায়? কীভাবে এই জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হব?’
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে প্রায় ৮০ থেকে ৮৫টি ওষুধের দোকান রয়েছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। জরুরি প্রয়োজনে তাঁদের অনেককেই হাসপাতালের আশপাশের দোকান থেকে ওষুধ কিনতে হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, হাসপাতালের সামনে ওষুধের বিক্রি বেশি হওয়ায় আগে কিছু দোকান তুলনামূলক কম লাভে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে পাইকারি দামের কাছাকাছি মূল্যে ওষুধ বিক্রি করত। এতে আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীরা উপকৃত হতেন বলে তাঁদের ধারণা। নতুন নির্দেশনার পর এই সুবিধা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
এদিকে, বেশি মুনাফার উদ্দেশ্যে কিছু ব্যবসায়ী এই নিয়ম চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সমিতির বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যুক্ত করে প্রতিবেদনটি আরও পূর্ণাঙ্গ করা যাবে।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করলে অসাধু চক্রের তৎপরতা বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। কোনো ব্যবসায়ী মুনাফার জন্য অসহায় রোগীদের জরুরি প্রয়োজনকে কাজে লাগালে তা অত্যন্ত অমানবিক।
তিনি বলেন, ব্যবসার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থেকে অনিয়মের সুযোগ পাচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার আরও বলেন, ওষুধের মূল্য নিয়ে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। সাধারণ মানুষ যাতে ন্যায্য মূল্যে ওষুধ কিনে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে পারেন, সে জন্য কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
চিকিৎসা নিতে এসে ওষুধের বাড়তি ব্যয় বহন করা অনেক রোগীর জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ। চিকিৎসকের ফি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের খরচ জোগাড় করতেই অনেক পরিবারকে হিমশিম খেতে হয়। এর মধ্যে ওষুধের দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা তাঁদের দুর্ভোগ আরও বাড়াচ্ছে।
রোগী ও তাঁদের স্বজনদের দাবি, ওষুধের মূল্য নির্ধারণ ও বিক্রির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত মূল্য, মূল্যছাড়ের প্রযোজ্যতা এবং বিক্রয়মূল্য নিয়ে কোনো অনিয়ম থাকলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে চিকিৎসা নিতে এসে কাউকে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপে পড়তে না হয়।

