স্বাস্থ্য ডেস্ক
বিশ্বজুড়ে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রায় ৩০ শতাংশ ফ্যাটি লিভার রোগে আক্রান্ত। এত দিন এ রোগকে একই ধরনের সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও নতুন এক গবেষণায় এর পাঁচটি স্বতন্ত্র জৈবিক ধরন শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষকদের মতে, প্রতিটি ধরনের সঙ্গে লিভার বিকল হওয়া, লিভার ক্যানসার ও হৃদরোগসহ গুরুতর জটিলতার ঝুঁকির ভিন্নতা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মায়ো ক্লিনিকের গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত এ গবেষণায় ভার্জিনিয়া টেকের গবেষকেরাও যুক্ত ছিলেন। গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার কমিউনিকেশন্স-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ (এমএএসএলডি) নামে পরিচিত ফ্যাটি লিভার রোগের পেছনে একাধিক জৈবিক প্রক্রিয়ার ভূমিকা উঠে এসেছে। এর কিছু ধরন স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। অন্য কিছু ধরন বংশগত জিনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জিনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ধরনে লিভারের গুরুতর ক্ষতির ঝুঁকি বেশি থাকতে পারে। প্রচলিত বিপাকীয় ঝুঁকির কারণ না থাকলেও এসব রোগীর ক্ষেত্রে রোগের জটিলতা দেখা দিতে পারে।
৪ হাজার ৬০০ রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ
গবেষণায় চার হাজার ৬০০ জনের বেশি এমএএসএলডি রোগীর জিনগত তথ্য ও বিস্তারিত চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি বিশ্লেষণ করা হয়। এতে লিভারের এনজাইমের মাত্রা, বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই), রক্তে চর্বির পরিমাণ এবং ডায়াবেটিস, বিষণ্নতা ও স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো স্বাস্থ্যসমস্যার তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হয়।
কম্পিউটারভিত্তিক উন্নত মডেল ব্যবহার করে গবেষকেরা রোগীদের জিনগত বৈশিষ্ট্য ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে মিল খুঁজে বের করেন। এ বিশ্লেষণে পাঁচটি স্বতন্ত্র রোগীগোষ্ঠী শনাক্ত হয়। প্রতিটি গোষ্ঠীর রোগের পেছনে আলাদা জৈবিক বৈশিষ্ট্য কাজ করছে বলে গবেষকেরা ধারণা করছেন।
তাঁদের মতে, এ আবিষ্কার ভবিষ্যতে ফ্যাটি লিভার রোগ শনাক্তকরণ, ঝুঁকি নিরূপণ ও চিকিৎসাপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে পারে। রোগীর জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং চিকিৎসার ইতিহাস বিশ্লেষণ করে কোন ধরনের ফ্যাটি লিভারে তিনি আক্রান্ত এবং কোন জটিলতার ঝুঁকি বেশি, তা আগেভাগে চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়াও সহজ হতে পারে।
কেন বিপজ্জনক ফ্যাটি লিভার
লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমে ফ্যাটি লিভার রোগের সৃষ্টি হয়। রোগটির বর্তমান নাম এমএএসএলডি; আগে এটি নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ নামে পরিচিত ছিল। আক্রান্ত অনেকের শরীরে দীর্ঘদিন দৃশ্যমান কোনো উপসর্গ থাকে না। ফলে রোগটি অনেক সময় শনাক্ত না হয়েই থেকে যায়।
সব রোগীর ক্ষেত্রে গুরুতর জটিলতা তৈরি না হলেও কারও কারও লিভারে প্রদাহ ও ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে। সময়ের সঙ্গে এ ক্ষতি বাড়তে থাকলে সিরোসিস হতে পারে। এ অবস্থায় লিভারে ব্যাপক ক্ষত তৈরি হওয়ায় অঙ্গটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
বিশ্বজুড়ে লিভার সিরোসিস, লিভার ক্যানসার এবং লিভার প্রতিস্থাপনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ ফ্যাটি লিভার-সংশ্লিষ্ট জটিলতা। একই রোগে আক্রান্ত হয়েও কেন কোনো কোনো রোগীর অবস্থা গুরুতর হয়ে ওঠে, অথচ অন্যদের ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটে না—দীর্ঘদিন ধরেই এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন গবেষকেরা।
জিনগত তথ্য বিশ্লেষণে নতুন সম্ভাবনা
গবেষকেরা মায়ো ক্লিনিকের রিসার্চ ডেটা অ্যাটলাস ব্যবহার করে রোগীদের জিনগত তথ্যের সঙ্গে তাঁদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি মিলিয়ে দেখেন। এ পদ্ধতিতে বিপুলসংখ্যক মানুষের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে এমন সম্পর্ক শনাক্ত করা সম্ভব, যা অল্পসংখ্যক রোগীর তথ্য পর্যালোচনা করে সহজে বোঝা যায় না।
এ গবেষণায় মায়ো ক্লিনিকের ট্যাপেস্ট্রি স্টাডির তথ্যও ব্যবহার করা হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় এক লাখের বেশি অংশগ্রহণকারীর এক্সোম-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এক্সোম হলো ডিএনএর সেই অংশ, যাতে শরীরের বিভিন্ন কাজের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরির নির্দেশনা থাকে। এসব তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে রোগের সূচনা ও অগ্রগতিতে প্রভাব ফেলতে পারে এমন বংশগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
গবেষকদের মতে, জিনগত তথ্য ও চিকিৎসার ইতিহাস একসঙ্গে বিশ্লেষণ করার ফলে জটিল রোগের ভিন্ন ভিন্ন ধরন আরও নির্ভুলভাবে শনাক্ত করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিষণ্নতা, মাইগ্রেন ও স্লিপ অ্যাপনিয়ার সম্পর্ক
গবেষণায় ফ্যাটি লিভারের নির্দিষ্ট কিছু ধরনের সঙ্গে বিষণ্নতা, স্লিপ অ্যাপনিয়া ও মাইগ্রেনের সম্পর্কও পাওয়া গেছে। এতে বোঝা যায়, ফ্যাটি লিভারের বিভিন্ন ধরন শুধু লিভারের সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে; শরীরের অন্যান্য স্বাস্থ্যসমস্যার সঙ্গেও এর যোগসূত্র থাকতে পারে।
তবে এসব সম্পর্কের ভিত্তিতে ফ্যাটি লিভার সরাসরি ওই রোগগুলোর কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। গবেষকেরা মনে করছেন, লিভারের স্বাস্থ্য ও শরীরের অন্যান্য জৈবিক প্রক্রিয়ার মধ্যকার সম্পর্ক আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
ভবিষ্যতে রোগীভিত্তিক চিকিৎসার সম্ভাবনা
গবেষক দল আরও বড় ও বৈচিত্র্যপূর্ণ রোগীগোষ্ঠীর মধ্যে এ ফলাফল যাচাই করার পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি ফ্যাটি লিভারের বিভিন্ন ধরন প্রচলিত চিকিৎসায় ভিন্নভাবে সাড়া দেয় কি না, তা-ও পরীক্ষা করা হবে।
এ ক্ষেত্রে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও স্থূলতার চিকিৎসায় ব্যবহৃত জিএলপি-১ রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট শ্রেণির ওষুধের কার্যকারিতাও মূল্যায়ন করা হতে পারে। গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে ফ্যাটি লিভারের রোগীদের ঝুঁকি অনুযায়ী আলাদা চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ধারণে সহায়তা করতে পারে বলে আশা করছেন গবেষকেরা।

