রাজনীতি ডেস্ক
‘আরেকটি অনিবার্য বিপ্লব আমাদের দরজায় টোকা দিচ্ছে’ বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, এই বিপ্লবের জন্য মুক্তিকামী দেশবাসীকে প্রস্তুত থাকতে হবে। বিশেষ করে যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষাকে পদদলিত করা হচ্ছে উল্লেখ করে তাদের আরেকবার লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নসহ ১১ দলীয় ঐক্যের সাত দফা দাবি অবিলম্বে মেনে নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। আগামী ৯ নভেম্বর সংসদ অধিবেশন শুরুর আগেই গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়ার জন্য সরকারকে সময়সীমা বেঁধে দেন জামায়াতের আমির। অন্যথায় জনগণের দাবি আদায়ে আন্দোলন অব্যাহত রাখার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
শনিবার সকালে রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-খুলনা-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘দাবিগুলো মেনে নিন, সুস্থ ধারায় ফিরে আসুন। ৯ তারিখ সংসদ অধিবেশনের আগেই নিজেদের মূল সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে এসে ঘোষণা দিন যে আমরা গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করব। তাহলে পরবর্তী আর কোনো কর্মসূচি আপাতত বিরোধী দলের নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু যদি তা না দেন, তাহলে জনগণের এই দাবি, ৭০ ভাগ মানুষের ভোট—এই দুটিকে ইনশা আল্লাহ আমরা অপমানিত হতে দেব না; আদায় করে ছাড়ব।’
যুবসমাজের উদ্দেশে জামায়াতের আমির বলেন, তারা রাজপথে লড়াই করে জাতিকে সাময়িক মুক্তি এনে দিয়েছে। এই মুক্তিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে তাদের আবারও লড়াই করতে হবে। কোনো প্রলোভন বা ষড়যন্ত্রে কান না দিয়ে বৃহত্তর ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তারা কোনো দলীয় বা ব্যক্তিগত দাবি নিয়ে মাঠে নামেননি; বরং জনগণের অধিকার ও ভোগান্তির বিষয়গুলো নিয়েই আন্দোলন করছেন। এর আগে দুটি লংমার্চ জনগণের সমর্থন ও ভালোবাসায় সফল হয়েছে। এবারও তৃতীয় লংমার্চ সফল হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সাত দফার মূল দাবি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন
১১ দলীয় ঐক্যের সাত দফা দাবির মূল বিষয় গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই গণরায় বাস্তবায়ন না হওয়ায় বাকি ছয় দফার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। একটি দাবি বাস্তবায়িত হলে অন্য দাবিগুলোর প্রয়োজন হতো না বলে মনে করেন তারা।
তিনি বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়িত হলে চাঁদাবাজ, দখলদার, দুর্নীতিবাজ ও মাদক কারবারিরা মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগ পেত না।
বিএনপির সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, দলটি জাতিকে হতাশ করেছে এবং ঐতিহাসিক প্রতারণা করেছে। প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা রক্ষা করেনি। জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে মিথ্যাচার করে জাতির আকাঙ্ক্ষা ও গণরায়কে উপহাস করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিএনপিকে বলেছিলাম, ভালোয় ভালোয় এখান থেকে ফিরে আসুন, গণরায় বাস্তবায়ন করুন; তা না হলে আপনাদের উচ্চ মূল্য দিতে হবে। সেদিকেই সম্ভবত বিএনপি আগাচ্ছে।’
জামায়াতের আমিরের অভিযোগ, বিএনপি অতীতের স্বৈরাচারী শাসন ও নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা নেয়নি। বরং প্রতিদিন নতুন নতুন সমস্যা তৈরি করে জাতির দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে।
মাতারবাড়ী বন্দর নিয়ে প্রশ্ন
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিদেশ সফরের প্রসঙ্গ টেনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, চার দিনের সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরেছেন। কী কারণে তিনি সফরে গিয়েছিলেন এবং কী অর্জন নিয়ে ফিরেছেন, তা জাতির সামনে স্পষ্ট করতে হবে।
বিশেষ করে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে কোনো ধরনের লুকোচুরি হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে জনগণকে অবহিত করার দাবি জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘কানেক্টিভিটির নামে বাংলাদেশকে কারো কাছে ইজারা দেওয়া চলবে না।’
অতীতে যারা দাসত্ব স্বীকার করেছিল, তারা এখন তার পরিণতি ভোগ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে পার পাওয়া যাবে না।
সাত দফা দাবিতে লংমার্চ
১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদের উদ্বোধনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সকাল ৭টায় সমাবেশ শুরু হয়।
তিনি বলেন, জনগণের দাবি আদায়ের লক্ষ্যেই এই লংমার্চের আয়োজন করা হয়েছে। অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার কমিটি গঠন করে সংবিধান সংস্কার করতে হবে। তা না হলে সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, নেজামে ইসলাম পার্টির আমির মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম ছোবহানী, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চান এবং খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম ও ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমসহ অন্য নেতারা। তবে সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কোনো প্রতিনিধিকে দেখা যায়নি।
ঢাকা থেকে খুলনার পথে লংমার্চ
সমাবেশে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী অংশ নেন। উদ্বোধনী সমাবেশ শেষে সকাল ৮টা ২০ মিনিটে লংমার্চের গাড়িবহর যাত্রা শুরু করে। এতে নেতৃত্ব দেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা থেকে ছয় শতাধিক গাড়ি নিয়ে লংমার্চ শুরু হয়েছে। পথে আরও প্রায় দেড় হাজার গাড়ি বহরে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রায় সোয়া চারশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ১৯ জেলার নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণে এই কর্মসূচি আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
লংমার্চের বহর ঢাকার বাইরে পর্যায়ক্রমে ছয়টি নির্ধারিত স্থানে পথসভা এবং বিভিন্ন স্থানে অনির্ধারিত সভা করবে। রাতে কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
যেসব স্থানে পথসভা
কর্মসূচি অনুযায়ী, ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে সকাল ৯টায় শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবায় প্রথম পথসভা হওয়ার কথা। এরপর সকাল ১১টায় বাগেরহাটের ফকিরহাটের কাঁটাখালী মোড়ে পথসভা অনুষ্ঠিত হবে।
খুলনা মহানগরীর বাবরী চত্বরে বেলা সাড়ে ১২টায় এবং ফুলতলার স্বাধীনতা চত্বরে দুপুর ২টায় পথসভা হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর বিকেল সাড়ে ৩টায় যশোরের মুড়লীর মোড় এবং বিকেল ৫টায় ঝিনাইদহের চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড মোড়ে পথসভা অনুষ্ঠিত হবে।
সবশেষে রাত সাড়ে ৮টায় কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী জনসভায় অংশ নেবেন লংমার্চের নেতারা।
১১ দলীয় ঐক্যের সাত দফা দাবি
১১ দলীয় ঐক্যের সাত দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।

