আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
দীর্ঘদিন ধরে গাজা, লেবানন, ইরানসহ একাধিক ফ্রন্টে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাতের ফলে দেশটির সামরিক বাহিনীর অস্ত্র, সামরিক যান ও জনবলের ওপর চাপ বাড়ছে বলে সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, সেনাদের ছুটি বাতিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নতুন অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টার কেনার পরিকল্পনা আটকে যাওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
তবে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, ইসরায়েলি বাহিনীর কথিত সংকটের বিষয়টি কেবল সামরিক সক্ষমতার ঘাটতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং আন্তর্জাতিক উৎস থেকে আরও অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের কৌশলের অংশ হিসেবেও এসব তথ্য সামনে আসতে পারে।
ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ ও দৈনিক মারিভের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের যুদ্ধের কারণে দেশটির বিপুলসংখ্যক ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব সামরিক যান মেরামতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নিয়েও চাপ রয়েছে। একই সময়ে বাজেটসংকটের কারণে মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১২টি অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টার কেনার পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ পরিস্থিতিতে সামরিক ব্যয় বাড়ানো নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদের মতৈক্য হয়নি বলে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তবে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হামজে আত্তারের মতে, ইসরায়েলি বাহিনীতে বড় ধরনের সামরিক সংকট তৈরি হয়েছে—এমন ধারণা অতিরঞ্জিত হতে পারে। আলজাজিরাকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও দ্রুত অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের সংকটের বয়ান ইসরায়েলের পুরোনো কৌশলের অংশ।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, অন্যান্য দেশ যে পরিমাণ অস্ত্রের মজুতকে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত মনে করে, ইসরায়েল একই পরিমাণকে সংকটজনক হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। এর অন্যতম কারণ হলো, ইসরায়েল একই সময়ে একাধিক ফ্রন্টে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে চায়।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি বা রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তনের আগেই দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্র সরবরাহের চুক্তিগুলো নিশ্চিত করা ইসরায়েলের অন্যতম লক্ষ্য। এ প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের কাছে বিপুলসংখ্যক ভারী বোমা বিক্রির উদ্যোগের কথাও সামনে এসেছে।
এদিকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে ইসরায়েলি বাহিনীতে জনবলের প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে। ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির সামরিক বাহিনীতে প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার ৫০০ সক্রিয় সেনা এবং ৪ লাখ ৬৫ হাজার রিজার্ভ সেনা ছিল। তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সেনাসংখ্যা আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন ইসরায়েলি সেনাপ্রধান এজাল জামির।
তিনি পুরুষদের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার মেয়াদ ৩৬ মাস করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে উগ্র অর্থোডক্স বা হারেদি সম্প্রদায়ের তরুণদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের বিষয়টিও ইসরায়েলে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট হারেদি তরুণদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের নির্দেশ দেওয়ার পরও ব্যাপকসংখ্যক তরুণ এতে সাড়া দেননি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ২৪ হাজার সমন পাঠানো হলেও মাত্র ১ হাজার ২০০ জন সাড়া দিয়েছেন।
তবে সামগ্রিকভাবে গাজা, লেবানন, ইরান, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও সিরিয়ায় চলমান সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রাখার মতো অস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতা ইসরায়েলের হাতে রয়েছে বলে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করে।
তাদের মতে, ভবিষ্যতে নতুন কোনো আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাতের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে ইসরায়েল আগাম সামরিক সরঞ্জাম, অস্ত্র ও জনবলের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে আনছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে একদিকে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বাস্তব চাপ, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ সামরিক প্রস্তুতি ও অস্ত্র সংগ্রহের কৌশল দুই দিক থেকেই দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।

