রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬ যোগাযোগ আমাদের পরিচয়
English
সর্বশেষ খুলনাকে পরিচ্ছন্ন, যানজট ও দখলমুক্ত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে চাই: নজরুল ইসলাম মঞ্জু ● খুলনার লবণচরায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে যুবক নিহত ● প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে স্থাপিত তোরণ-ব্যানার অপসারণের নির্দেশ খুলনা বিএনপির ● টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে এক ধাপ পিছিয়ে বাংলাদেশ ● যেকোনো হুমকির জবাবে তাৎক্ষণিক পাল্টা আঘাতের নির্দেশ খামেনির
খুলনা বিভাগ

ঋণকে পুঁজি করে স্বাবলম্বী গোনালী আদর্শ মৎস্যজীবী গ্রাম সমিতির সদস্যরা

ডুমুরিয়া (খুলনা) প্রতিনিধি:

একসময় আর্থিক সংকট ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। জীবিকা নির্বাহে সীমিত আয় ও অনিশ্চিত কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভর করতে হতো। সেই বাস্তবতা বদলাতে ঋণকে কাজে লাগিয়েছেন খুলনার ডুমুরিয়ার গোনালী আদর্শ মৎস্যজীবী গ্রাম সমিতির সদস্যরা। কেউ মাছ চাষ করছেন, কেউ জাল তৈরি করছেন। কেউ গড়ে তুলেছেন গবাদিপশু ও পোল্ট্রি খামার। আবার কেউ মাছের ব্যবসা, মুদি দোকান কিংবা ভ্যান-ইজিবাইক চালিয়ে বাড়িয়েছেন আয়।

সঠিক খাতে ঋণের ব্যবহার, নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ, শতভাগ সঞ্চয় এবং নিয়মিত তদারকির কারণে সমিতিটি এখন মৎস্যজীবীদের স্বাবলম্বী হওয়ার একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সমিতি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে গোনালী আদর্শ মৎস্যজীবী গ্রাম সমিতির সদস্যসংখ্যা ৮৫। তাঁদের মধ্যে ২০ জন মাছ চাষ, ২০ জন গাভী পালন, পাঁচজন মাছের ব্যবসা, ছয়জন ক্ষুদ্র ব্যবসা, তিনজন মুদি দোকান, ১৮ জন ভ্যান ও ইজিবাইক, সাতজন জাল তৈরি এবং সাতজন হাঁস-মুরগি পালনের জন্য ঋণ নিয়েছেন।

সমিতির ২৫ থেকে ৩০ জন সদস্য আগে সাগর ও সুন্দরবন এলাকায় মাছ ধরতে যেতেন। তাঁদের অনেকে এখন সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে বিকল্প আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছেন। ফলে অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ জীবিকার পাশাপাশি নিজেদের আয় ও কর্মসংস্থানের নতুন পথ তৈরি হয়েছে।

সমিতির সদস্য স্বপন বিশ্বাস জাল তৈরির জন্য ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন। আকরাম সরকার মাছ চাষের জন্য নিয়েছেন ৪০ হাজার টাকা। মঞ্জু রানি সরকার গাভী পালন, মিলন সরকার পোল্ট্রি খামার এবং বিপ্লব বিশ্বাস ইজিবাইক কেনার জন্য ঋণ নিয়েছেন। জাল তৈরির কাজে ঋণ নিয়েছেন কল্পনা বিশ্বাস, রূপালী বিশ্বাস, মীরা বিশ্বাস, আন্না রানি বিশ্বাস, অনিমা ও কৃষ্ণা সরকারসহ আরও কয়েকজন।

একসময় দাদন নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে যেতেন প্রশান্ত সরকার, চিত্ত সরকার ও বিশ্বজিৎ সরকার। এখন তাঁরা সমিতির ঋণ নিয়ে বিকল্প পেশায় যুক্ত হয়েছেন। প্রশান্ত সরকার মাছ চাষ ও গাভী পালনের পাশাপাশি মাঝে মধ্যে ভ্যান চালান। চিত্ত সরকার জাল বুনে ভাড়া দেন এবং ঘেরে জাল টানেন। বিশ্বজিৎ সরকার ভ্যান চালানোর পাশাপাশি ঘেরে জাল টানার কাজ করেন।

মাছ চাষেও ঋণের অর্থ ব্যবহার করে এগিয়ে যাচ্ছেন সমিতির সদস্যরা। মাধব বিশ্বাস, আকরাম সরদার, সাধন সরকার ও শিবপদ বিশ্বাস প্রত্যেকে ৫০ হাজার টাকা করে ঋণ নিয়েছেন।

ডুমুরিয়া উপজেলা ফিশারিজ ফেডারেশনের কো-অর্ডিনেটর কাকলী বিশ্বাস বলেন, গোনালী আদর্শ মৎস্যজীবী গ্রাম সমিতির কার্যক্রম খুবই ভালো। দেশের প্রায় ৪৫০টি গ্রাম সমিতির মধ্যে এটি শীর্ষ পাঁচের মধ্যে রয়েছে। সদস্যরা যে উদ্দেশ্যে ঋণ নেন, সেই খাতেই অর্থ ব্যবহার করেন। পাশাপাশি সমিতির কমিটিগুলোও নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে।

তিনি বলেন, উপজেলা মৎস্য অফিসের নিয়মিত মনিটরিং ও দিকনির্দেশনার ফলে সদস্যরা নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করছেন। সমিতির সঞ্চয়ের হারও ১০০ শতাংশ। প্রতি মাসের কিস্তি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়। ফলে ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা বজায় রয়েছে।

সমিতির সভাপতি প্রশান্ত সরকারের পক্ষে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন অঞ্জনা সরকার। তিনি জানান, সমিতিতে ৮৫ জন সদস্য থাকলেও বর্তমানে মেয়াদোত্তীর্ণ কোনো বকেয়া নেই।

অঞ্জনা সরকার নিজেও সমিতি থেকে দুই দফায় ঋণ নিয়েছেন। তাঁর ৫০ শতকের একটি ঘের রয়েছে। প্রথমবার ৪০ হাজার এবং দ্বিতীয়বার ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে মাছ চাষে বিনিয়োগ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, এই ঋণের অর্থ তাঁকে নিজের কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখতে সহায়তা করেছে।

সমিতির সাফল্যের পেছনে মৎস্য অফিসের নিয়মিত তদারকির কথাও উল্লেখ করেন অঞ্জনা সরকার। তিনি বলেন, মৎস্য অফিসের কর্মকর্তারা নিয়মিত খোঁজখবর নেন এবং সমিতির কার্যক্রম তদারকি করেন। মাসিক ও ত্রৈমাসিক সভা হচ্ছে কি না, সদস্যরা নিয়মিত টাকা জমা দিচ্ছেন কি না—এসব বিষয়ে নজর রাখা হয়। অফিসে গেলে টাকা জমার স্লিপ ও আদায় শিট মিলিয়ে দেখা হয়। কোনো সমিতিতে বকেয়া থাকলে তা আদায়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি যাচাই-বাছাই করে ঋণ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া সাবেক এসডিএফ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি মৎস্য অফিসের পলাশ কুমার সেন ও অর্চন বসুর সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন অঞ্জনা সরকার। সমিতির সদস্য সাধনা, কবিতা, বাসন্তী, সুমিত্রা, সুকুমার ও গোবিন্দসহ সংশ্লিষ্টদের অবদানের কথাও তিনি স্মরণ করেন।

ডুমুরিয়া মৎস্য অফিসের ক্ষেত্র সহকারী পলাশ কুমার সেন বলেন, সমিতির সদস্যরা ঋণের অর্থ নির্ধারিত খাতেই ব্যবহার করছেন। তাঁরা নিয়মিত কিস্তি ও সঞ্চয় জমা দিচ্ছেন। মাঠপর্যায়ে ঋণের সঠিক ব্যবহার এবং সদস্যদের কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করা হয়। কোনো সমস্যা দেখা দিলে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

উপজেলা ফিশারিজ ফেডারেশনের সভাপতি কমলা বিশ্বাস বলেন, সদস্যরা যে উদ্দেশ্যে ঋণ নিচ্ছেন, সেই কাজেই অর্থ ব্যবহার করছেন। একই সঙ্গে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ ও সঞ্চয়ের ক্ষেত্রেও তাঁরা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন। সমিতির কমিটিগুলোও নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে।

তিনি বলেন, শুধু ঋণ বিতরণ করলেই হবে না। ঋণ উৎপাদনমুখী কাজে ব্যবহার হচ্ছে কি না, নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ ও সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও নজরদারিতে রাখতে হবে। ঋণ দেওয়ার আগে সদস্যের প্রয়োজন ও সক্ষমতা যাচাই এবং ঋণ দেওয়ার পর অর্থ সঠিক খাতে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সোহেল মোঃ জিল্লুর রহমান রিগান বলেন, মৎস্যজীবীদের স্বাবলম্বী করতে গ্রাম সমিতিগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। ঋণ যেন নির্ধারিত খাতে ব্যবহার হয় এবং কিস্তি ও সঞ্চয় নিয়মিত জমা হয়, সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ঋণ দেওয়ার আগে সদস্যদের প্রয়োজন ও সক্ষমতা যাচাই এবং বকেয়া আদায়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, গোনালী আদর্শ মৎস্যজীবী গ্রাম সমিতির কার্যক্রম শুধু ঋণ নেওয়া ও পরিশোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সঞ্চয়, নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ, ঋণের সঠিক ব্যবহার, নেতৃত্ব, দায়িত্বশীলতা এবং মাঠপর্যায়ের তদারকির সমন্বয়ে সদস্যরা নিজেদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ পাচ্ছেন। এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে মৎস্যজীবী পরিবারগুলোর আয় ও জীবনমান উন্নয়নে এ ধরনের সমিতি আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

একটি মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Notice: ob_end_flush(): Failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/modhumot/public_html/wp-includes/functions.php on line 5581