স্পোর্টস ডেস্ক:
লিওনেল মেসি ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। মেসি তার পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারজুড়ে অসংখ্য ব্যক্তিগত রেকর্ড ও পুরস্কার অর্জন করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে আটটি ব্যালন ডি’ অর, ছয়টি ইউরোপীয় গোল্ডেন বুট, এবং ফিফা কর্তৃক আটবার শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় নির্বাচিত হওয়া। ২০২৫ সালে আইএফএফএইচএস তাকে সর্বকালের সর্বসেরা পুরুষ ফুটবলার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
মেসির পুরো নাম লিওনেল আন্দ্রেস মেসি আর্জেন্টিনার রোজারিওতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা হোর্হে হোরাসিও মেসি ইস্পাতের কারখানায় কাজ করতেন এবং মা সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনি ছিলেন একজন খণ্ডকালীন পরিচ্ছন্নতা কর্মী। তার পৈতৃক নিবাস ছিল ইতালির আকোনা শহরে। তার পূর্বপুরুষদের একজন অ্যাঞ্জেলো মেসি ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে সেখান থেকে আর্জেন্টিনায় চলে আসেন।মেসির বড় দুই ভাই এবং এক ছোট বোন রয়েছে। বড় দুই ভাইয়ের নাম রদ্রিগো ও মাতিয়াস এবং ছোট বোনের নাম মারিয়া সল। পাঁচ বছর বয়সে মেসি স্থানীয় ক্লাব গ্রান্দোলির হয়ে ফুটবল খেলা শুরু করেন, যার কোচ ছিলেন তার বাবা হোর্হে। ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে মেসি রোজারিও ভিত্তিক ক্লাব নি ওয়েল’স ওল্ড বয়েজে যোগ দেন।

২০০৪ সালের ১৬ অক্টোবর কাতালোনিয়ার মাঠে বদলি হিসেবে নেমেছিলেন ১৭ বছরের এক কিশোর। তখন কেউ হয়তো ভাবেননি, ছোটখাটো গড়নের এই তরুণ একদিন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হয়ে উঠবেন।
আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির অভিষেকও ছিল নাটকীয়। ২০০৫ সালে অভিষেকের পর মাত্র দুই মিনিট মাঠে থেকে লাল কার্ড দেখেছিলেন তিনি। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ পথচলা উত্থান, সাফল্য, হতাশা আর প্রত্যাবর্তনের।
বার্সেলোনায় পেপ গার্দিওলার অধীনে মেসি ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা শিল্পী হিসেবে। বাঁ পায়ের অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ, প্রতিপক্ষের একাধিক খেলোয়াড়কে কাটিয়ে বেরিয়ে যাওয়া এবং গোলের সামনে নিখুঁত ফিনিশিং তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। ২০১২ সালে এক পঞ্জিকাবর্ষে ৯১ গোল করে গড়েন অবিশ্বাস্য এক রেকর্ড।
ক্লাব ফুটবলে সাফল্যের পর সাফল্য এলেও জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির অপেক্ষা দীর্ঘ হয়েছে। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার। পরের বছর কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে পরাজয়। ২০১৬ সালেও একই প্রতিপক্ষের কাছে একই পরিণতি।
টানা তিনটি বড় ফাইনালে হারের পর নিউ জার্সির মাঠে মেসির হতাশ মুখ দেখে অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার হয়তো শেষ। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত স্থায়ী হয়নি।
আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে ফিরে আসেন মেসি। এবার আরও দৃঢ় ও ক্ষুধার্ত হয়ে। ২০২১ সালে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয়ের মধ্য দিয়ে অবশেষে জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপার স্বাদ পান তিনি। তবে তখনও একটি অপূর্ণতা ছিল বিশ্বকাপ।

যে ট্রফির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা, যে শিরোপাকে ঘিরে ছিল অসংখ্য প্রশ্ন ও সমালোচনা, সেটিই তখনও অধরা। এরপর আসে ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর। কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে ফ্রান্সের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনাল।
সেই ম্যাচে যেন মেসির পুরো ক্যারিয়ারের প্রতিচ্ছবি দেখা যায় সাফল্য, ব্যর্থতা, হতাশা, প্রত্যাবর্তন এবং শেষ পর্যন্ত বিজয়। নাটকীয় ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তুলে নেন মেসি। বহু বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটে।
যে খেলোয়াড়কে একসময় জাতীয় দলের হয়ে কিছুই জিততে পারেননি বলে সমালোচনা করা হয়েছিল, সেই মেসিই শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম আরও গভীরভাবে লিখে দেন।
এরপর বদলেছে অনেক কিছু। বার্সেলোনার ক্যাম্প ন্যু থেকে প্যারিস, সেখান থেকে মায়ামি বদলেছে মেসির ঠিকানা। বয়স বেড়েছে, শরীরও আগের মতো সাড়া দেয় না। কিন্তু তার বাঁ পায়ের জাদু কিংবা সমর্থকদের ভালোবাসা কমেনি।
আজ বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামবেন মেসি। জাতীয় দলের হয়ে তার ২১ বছরের পথচলার শেষ ম্যাচ এটি। এই ম্যাচে তার সামনে আর কোনো অপূর্ণ স্বপ্ন নেই। বিশ্বকাপ জয়ের চাপ নেই, শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের তাড়াও নেই।

গ্যালারিতে উঠবে ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনি। কেউ হয়তো চোখ মুছবেন। কেউ ফিরে যাবেন ২০০৪ সালের সেই কিশোরের সময়ে। কেউ মনে করবেন মারাকানার কান্না, কেউ ফিরে যাবেন লুসাইলের সেই ঐতিহাসিক রাতে।
আর মেসি? হয়তো শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার জার্সিতে বলটি বাঁ পায়ে নেবেন। পরিচিত সেই গতি, বাঁক, পাস কিংবা নিখুঁত নিয়ন্ত্রণে আরও একবার মাঠে ফুটবলের সৌন্দর্য দেখাবেন।
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় আজ লেখা হবে। কিন্তু তার গল্পের কি সত্যিই শেষ আছে? ফুটবল যতদিন থাকবে, ততদিন মারাকানার কান্না থেকে লুসাইলের বিজয় মেসির এই অবিশ্বাস্য যাত্রাও বেঁচে থাকবে।

