ন্যাশনাল ডেস্ক:
ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে বক্তব্য ও রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে গেলে এর দায় ভারত এড়িয়ে যেতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইলে সেই সম্পর্ককে পারস্পরিক মর্যাদা, সম্মান ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হবে।
শনিবার (৮ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দল ও ইউট্যাব আয়োজিত ‘জুলাই অভ্যুত্থানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র এবং দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও কৌশলগত পারস্পরিক নির্ভরশীলতা রয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। তবে সেই সম্পর্ক কোনো পক্ষের আধিপত্য বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ভিত্তিতে নয়; বরং সমমর্যাদা ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতেই হওয়া উচিত।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দিল্লিতে থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে তার বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক—দুটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ভারতের পক্ষ থেকে যদি স্পষ্টভাবে বলা হয় যে বাংলাদেশের বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার বক্তব্যকে দেশটি সমর্থন করে না, তাহলে বাংলাদেশ সেই অবস্থানকে গ্রহণ করবে। তবে একই সময়ে তাকে ভারতে বসে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের আপত্তি রয়েছে।
তিনি বলেন, গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে—এমন একজন রাজনৈতিক নেতাকে কীভাবে ভারত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির নেতা হিসেবে বিবেচনা করতে পারে, সেটি প্রশ্নের বিষয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগ, দিল্লিতে অবস্থান করে শেখ হাসিনা এমন বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পাশাপাশি দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। ফলে তার রাজনৈতিক তৎপরতার বিষয়ে ভারত কোনোভাবেই সম্পূর্ণ দায়মুক্ত থাকতে পারে না।
‘হাসিনা কার্ড’ নিয়ে ভারতের প্রতি বার্তা
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়। কিন্তু ভারত যদি একই সঙ্গে ‘হাসিনা কার্ড’ ব্যবহার করে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রত্যাশা করে, তাহলে দুই অবস্থান একসঙ্গে টেকসই হতে পারে না।
তার ভাষায়, প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানের বিকল্প নেই। কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অন্য দেশের ভূমিকা বা প্রভাবের প্রশ্ন উঠলে সেই সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার প্রসঙ্গেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি অতীতে শেখ হাসিনার দেওয়া একটি বক্তব্যের উল্লেখ করে বলেন, ভারতকে বাংলাদেশ যা দিয়েছে, তা দেশটি চিরদিন মনে রাখবে—এমন বক্তব্য শেখ হাসিনা নিজেই দিয়েছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টিকে দুই দেশের সম্পর্কের ‘পারস্পরিক প্রতিদান’ হিসেবেও দেখা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘জুলাই অভ্যুত্থান ৩৬ দিনের ঘটনা নয়’
আলোচনায় ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েও কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনকে কেবল ৩৬ দিনের একটি আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসকে খাটো করা হবে।
তার দাবি, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ১৭ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক সংগ্রাম। জুলাই গণঅভ্যুত্থান হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি; দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলন ও মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামের মধ্য দিয়েই এর ভিত্তি তৈরি হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো ‘নিউটনের আপেল’ ছিল না যে হঠাৎ গাছ থেকে পড়ে গেল। বরং দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় এই গণঅভ্যুত্থানের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তাই শুধু ৩৬ দিনের ঘটনাপ্রবাহ দিয়ে ১৭ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রামকে মূল্যায়ন করা হলে তা হবে ইতিহাসের একটি বড় অংশকে উপেক্ষা করা।
ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রই ছিল মূল আকাঙ্ক্ষা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, ২০২৪ সালের আন্দোলনের প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল জনগণের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। তিনি বলেন, প্রচলিত অর্থে এটি কোনো সামাজিক বা অর্থনৈতিক বিপ্লব ছিল না; বরং মানুষের ভোটাধিকার, রাজনৈতিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ছিল।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসকে শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যথাযথভাবে বোঝা সম্ভব নয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে হলে এর পেছনে থাকা দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক সংগ্রামকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

