ন্যাশনাল ডেস্ক:
রাজধানীর উত্তরা এলাকায় ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য নেওয়া ডিএল পেট্রোল পাম্পের ১ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা সশস্ত্র ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছে। তিনটি মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা পরিকল্পিতভাবে টাকা বহনকারী গাড়ির গতিরোধ করে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকার ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়।
রোববার (৯ আগস্ট) সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে উত্তরা র্যাব-১ ব্যাটালিয়নের দক্ষিণ পাশে এ ঘটনা ঘটে।
পুলিশের ধারণা, ঘটনাটি আকস্মিক কোনো ছিনতাই নয়; বরং টাকা বহনের সময়, পথ ও অর্থের পরিমাণ সম্পর্কে আগে থেকেই তথ্য জানার পর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়ে থাকতে পারে। বিশেষ করে শুক্র ও শনিবারের দুই দিনের বিক্রির টাকা একসঙ্গে ব্যাংকে নেওয়া হবে এই তথ্য দুর্বৃত্তদের কাছে কীভাবে পৌঁছাল, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
যেভাবে ঘটল ছিনতাই
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পেট্রোল পাম্পের টাকা বহনকারী গাড়িটি ব্যাংকের উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর থেকেই তিনটি মোটরসাইকেলে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি সেটির পিছু নেয়।
উত্তরা র্যাব-১ ব্যাটালিয়নের দক্ষিণ পাশে পৌঁছালে দুর্বৃত্তরা সুযোগ বুঝে গাড়িটির গতিরোধ করে। মোটরসাইকেল দিয়ে গাড়িতে ধাক্কা দিয়ে সেটিকে থামানো হয়। এরপর ধারালো অস্ত্র প্রদর্শন করে ভয়ভীতি সৃষ্টি করা হয়। একপর্যায়ে গাড়ি থেকে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে দুর্বৃত্তরা।
ঘটনার পর পেট্রোল পাম্পের ম্যানেজার করিম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। মামলার এজাহারে ছিনতাই হওয়া টাকার পরিমাণ ১ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
সাধারণ দিনের চেয়ে রোববার কেন এত টাকা?
এই প্রশ্নের উত্তরেই মিলতে পারে ছিনতাইয়ের নেপথ্যের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
পেট্রোল পাম্প-সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডিএল পেট্রোল পাম্পে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টাকার লেনদেন হয়। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিদিনের বিক্রির অর্থ পরদিন সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে ব্যাংকে জমা দিতে নেওয়া হতো।
কিন্তু শুক্র ও শনিবার ব্যাংক বন্ধ থাকায় ওই দুই দিনের বিক্রির টাকা রোববার একসঙ্গে ব্যাংকে নেওয়া হয়। ফলে স্বাভাবিক দিনের তুলনায় রোববার বহন করা অর্থের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি ১ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
আর ঠিক সেই দিন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই টাকা বহনকারী গাড়িটি দুর্বৃত্তদের হামলার মুখে পড়ে।
পরিকল্পিত ছিনতাইয়ের সন্দেহ
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রায় একই সময়ে পেট্রোল পাম্পের টাকা ব্যাংকে নেওয়া হতো। ফলে টাকা বহনের সময় ও রুট সম্পর্কে কেউ আগে থেকেই তথ্য সংগ্রহ করেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশেষ করে রোববার দুই দিনের বিক্রির টাকা একসঙ্গে ব্যাংকে নেওয়া হবে এমন তথ্য দুর্বৃত্তরা আগে থেকেই জানত কি না, সেটিও তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে।
পুলিশ একই সঙ্গে খতিয়ে দেখছে, পেট্রোল পাম্পের ভেতর থেকে কেউ টাকা বহনের সময়, নির্ধারিত রুট বা ব্যাংকে জমা দেওয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করেছিল কি না।
সিসিটিভি ফুটেজে মিলবে কি পরিচয়?
ছিনতাইয়ের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। দুর্বৃত্তদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলগুলোর নম্বরও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। ছিনতাইয়ের আগে ও পরে মোটরসাইকেলগুলো কোন পথে চলাচল করেছে, সেই গতিপথও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ছিনতাই হওয়া টাকা উদ্ধার এবং জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক ইউনিট কাজ করছে।
উত্তরা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) তারেক আহমেদ বেগ বলেন, “এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই। তবে আমাদের একাধিক ইউনিট কাজ করছে। আশা করি শিগগির আসামি গ্রেপ্তার ও রহস্য উন্মোচন হবে।”
এখন তদন্তের মূল প্রশ্ন
ঘটনাটি তদন্তে কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—টাকা বহনের নির্দিষ্ট সময় কীভাবে জানা গেল, রোববার বিপুল পরিমাণ অর্থ একসঙ্গে নেওয়ার তথ্য দুর্বৃত্তদের কাছে ছিল কি না, গাড়িটি কোন রুটে যাবে তা তারা কীভাবে জানল এবং পেট্রোল পাম্পের ভেতর থেকে কেউ তথ্য পাচার করেছিল কি না।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিললে ১ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকার এই ছিনতাইয়ের নেপথ্যে থাকা পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করা সহজ হতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

