ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোটারদের মধ্যে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা বিতরণ এবং অর্থের বিনিময়ে ভোট কেনার প্রস্তুতির অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন। তাঁর অভিযোগ, ভোটার স্লিপ বিতরণের পাশাপাশি ভোটারদের টাকা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বিএনপির প্রার্থীকে ভোট দিলে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন দেলাওয়ার হোসেন। এ সময় তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা, নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্বাচনী কাজে ব্যবহারের অভিযোগও তুলে ধরেন।
দেলাওয়ার হোসেন বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন সরকারি সুবিধার কার্ড দেওয়ার কথা বলে ভোটারদের নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে তাঁরা অভিযোগ পেয়েছেন। একই সঙ্গে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষে ভোট দিলে এসব সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াতের এই প্রার্থী বলেন, ভোটার স্লিপ বিতরণের পাশাপাশি ভোটারদের ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে বলে তাঁদের কাছে তথ্য এসেছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা নির্বাচনী আচরণবিধির গুরুতর লঙ্ঘন হবে। বিষয়গুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন ইউনিয়নে, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বসবাসের এলাকায় অর্থের বিনিময়ে ভোট কেনার প্রস্তুতি চলছে বলে তাঁরা খবর পেয়েছেন। প্রশাসনকে এসব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে অর্থ, প্রলোভন কিংবা ভয়ভীতির কারণে কোনো ভোটার যেন ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বিরত না থাকেন, তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
প্রচারণায় বাধা ও হামলার অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে দেলাওয়ার হোসেন অভিযোগ করেন, গত ৮ অক্টোবর প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমিনের সমর্থকদের একটি অংশ পেশিশক্তি ও দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাঁর দাবি, প্রতীক বরাদ্দের আগেই বিএনপির প্রার্থীর ব্যানার ও ফেস্টুনে ঠাকুরগাঁও শহরের বিভিন্ন স্থান ছেয়ে ফেলা হয়েছিল।
ভোটার, ভোটকর্মী ও সাধারণ মানুষের বাড়িতে গিয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। এ ছাড়া কয়েকজন কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে বিএনপির প্রার্থীর গোপন বৈঠক, প্রচারণায় সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অনুদানের আশ্বাস এবং একজন সরকারি চাকরিজীবীর নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ তুলে ধরেন তিনি।
দেলাওয়ার হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৩ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে এশার নামাজের পর ভোটার ও দোকানদারদের সঙ্গে গণসংযোগের সময় তাঁকে বাধা দেওয়া ও লাঞ্ছিত করা হয়। ২০ অক্টোবর রুহিয়া উপজেলার ২ নম্বর আখানগর ইউনিয়নে নির্বাচনী বৈঠক শেষে তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে তাঁদের একজন কর্মী গুরুতর আহত হন এবং ডেকোরেশনের চেয়ার ভাঙচুর করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
এ ছাড়া ২১ অক্টোবর সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের বড় মাঠে তাঁদের নির্বাচনী জনসভার মঞ্চ তৈরির সময় বিএনপির প্রার্থীর সমর্থকেরা ব্যানার ও ফেস্টুন দিয়ে মাঠের বিভিন্ন অংশ ঘিরে ফেলেন বলে অভিযোগ করেন জামায়াতের প্রার্থী। পরে রিটার্নিং কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে সমাবেশের আগের রাতে সেগুলো সরানো হয় বলে জানান তিনি।
নারী কর্মীর পরিবারকে হুমকি দেওয়া এবং আরেক কর্মীর বাসায় গিয়ে সশস্ত্র ব্যক্তিদের প্রচারণা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও তোলেন দেলাওয়ার হোসেন। তাঁর দাবি, এসব ঘটনায় নির্বাচনী এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবহারের অভিযোগ
সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সম্পদ নির্বাচনী কাজে ব্যবহারের অভিযোগ তুলে দেলাওয়ার হোসেন বলেন, ২৭ অক্টোবর সকাল ৮টায় প্রচারণার সময়সীমা শেষ হওয়ার পর স্থানীয় এনজিও ইএসডিওর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাঁর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একত্র করে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন বলে তাঁরা অভিযোগ পেয়েছেন।
এ ছাড়া ২৪ ও ২৫ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালের প্রায় ২৪ জন সরকারি চিকিৎসককে দিয়ে তিনটি মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনার অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াতের এই প্রার্থী আরও বলেন, ২৮ অক্টোবর ‘মানব কল্যাণ’-এ সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক ও আপ্যায়নের আয়োজন করা হয়েছে বলে তাঁরা অভিযোগ পেয়েছেন। এসব অভিযোগের সমর্থনে ভিডিও ফুটেজ, স্থিরচিত্র ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং জুডিশিয়াল ইনকোয়ারি কমিটির কাছে জমা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে দেলাওয়ার হোসেন বলেন, তাঁদের করা অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে। নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও নির্বাচনী বৈঠকে চেয়ার ভাঙচুরের ঘটনায় দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। দল-মতনির্বিশেষে একই মানদণ্ড অনুসরণ করে অভিযোগ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
নির্বাচন বর্জন নয়, শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকার ঘোষণা
নির্বাচন বর্জনের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে দেলাওয়ার হোসেন বলেন, তাঁরা নির্বাচন বর্জন করতে আসেননি; প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এবং শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকতে চান। প্রশাসনের প্রস্তুতির কথা বিবেচনায় নিয়ে তাঁরা এখনো আস্থা রাখছেন। তবে ১৯৯৪ সালের মাগুরা নির্বাচনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে তখনকার অবস্থা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
ভোটার উপস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াতের এই প্রার্থী। তাঁর মতে, উপনির্বাচন হওয়ায় ঢাকার বাইরে থাকা অনেক ভোটারের আগ্রহ কম থাকতে পারে। পাশাপাশি বাড়িতে গিয়ে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগের কারণে ভোটাররা নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে আসতে পারবেন কি না, তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে।
সংখ্যালঘু ভোটারদের নিয়ে বিএনপির অভিযোগ নাকচ
সংখ্যালঘু ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আসতে বাধা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে বিএনপির অভিযোগের জবাবে দেলাওয়ার হোসেন বলেন, এ অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব নাগরিকের নিরাপদে ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ সব ভোটারকে নির্ভয়ে কেন্দ্রে এসে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানান তিনি।
দেলাওয়ার হোসেন বলেন, এই নির্বাচন শুধু একটি আসনের জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয় নয়; বরং নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠারও পরীক্ষা। দলীয় সরকারের অধীনেও অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব—আগামীকালের ভোটের মাধ্যমে সেই দৃষ্টান্ত স্থাপনের দায়িত্ব প্রশাসনের।
তবে সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমিন ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

