রাজনীতি ডেস্ক:
গত ১৬-১৭ বছরে বাংলাদেশকে একমুখী করার চেষ্টা হয়েছে এবং নীরবে-নিভৃতে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালানো হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে কালচার ফর ইউনিটি বাংলাদেশ আয়োজিত ‘লালনের তিরোধান দিবস—লালনের গান, মানুষের গান, মুক্তির গান’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রিজভী বলেন, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রক্ষমতা জোর করে দখলে রাখা ফ্যাসিস্ট শাসনামল স্থানীয় এজেন্টের ভূমিকা পালন করেছে। ভবিষ্যতেও নানা উপায়ে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের চেষ্টা হতে পারে। তবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা সুরক্ষার অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে নিজস্ব সংস্কৃতির গভীরতা উপলব্ধি করা, তা চর্চা ও অনুশীলন করা।
তিনি বলেন, সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ ও দমিয়ে রাখতে পারলে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার সহজ হয়। গত ১৬-১৭ বছরে সংস্কৃতিকে আজ্ঞাবহ করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। স্বাধীনতার কথা বললেও ক্ষমতা ধরে রাখতে গিয়ে দেশের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
একটি জাতির প্রধান বৈশিষ্ট্য তার সার্বভৌমত্ব কতটা শক্তিশালী, তা উল্লেখ করে বিএনপির এই নেতা বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব দুর্বল করার চেষ্টা হয়েছে।
বাংলাদেশের সিনেমা হলে ভারতীয় চলচ্চিত্র অবাধে প্রদর্শনের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিকে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন রিজভী। তাঁর মতে, দেশের সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্রশিল্পের স্বার্থ রক্ষায় এ বিষয়ে যথেষ্ট প্রতিবাদ হয়নি।
বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, পানির হিস্যা নিয়ে দেশপ্রেম থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার কারণে আবরারকে আক্রমণ করে হত্যা করা হয়েছিল। দেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও পানির অধিকার নিয়ে কথা বলার কারণে একজন শিক্ষার্থীকে কেন এমন পরিণতির শিকার হতে হবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
রিজভী বলেন, তরুণেরা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন। তাঁদের মধ্যে দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে ভাবনার বিকাশ ঘটেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই চেতনার প্রকাশ ঘটেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, কোনো সরকার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অপরাধ, হত্যা, গুম ও খুনের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়লে তার বিরুদ্ধে গণজাগরণ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানকে অন্য দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করাও সঠিক নয়। এ অভ্যুত্থান ছিল নিপীড়ন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনগণের জেগে ওঠার প্রকাশ।
নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য চর্চার ওপর গুরুত্ব দিয়ে রিজভী বলেন, বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। এগুলোর যথাযথ চর্চা হলে তা বিশ্বের সামনে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
লালন ফকিরের দর্শন তুলে ধরে তিনি বলেন, ইউরোপের রেনেসাঁর মতো প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া বাংলাদেশে না ঘটলেও এ দেশের মাটি থেকেই মানবতা, সাম্য এবং জাতপাতের বিভেদবিরোধী দর্শনের বিকাশ ঘটেছে। লালনের দর্শনে মানুষকে জানা ও নিজেকে চেনার যে আহ্বান রয়েছে, তা বাংলাদেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গভীরতা তুলে ধরে।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আব্দুস সালাম বলেন, লালনের দর্শনের মূল বার্তা ছিল মানুষ। তিনি সারাজীবন মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। বর্তমান সময়ে হিংসা ও হানাহানির মধ্যে লালনের সাম্য ও অহিংসার বাণী পথ দেখাতে পারে। লালনের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে পারলেই শান্তি খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক কাজী জেসিন বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের শাসনামলে শুধু গণতন্ত্র নয়, মানুষের সাংস্কৃতিক অধিকারও হরণ করা হয়েছিল। সে সময় মানুষের ওপর ভিনদেশি সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও নানা উপায়ে সংস্কৃতিচর্চা বাধাগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে কাজী জেসিন বলেন, মুক্ত সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া বর্তমান সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
অনুষ্ঠানে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

